বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার অন্যতম অনুঘটক ‘ফারাক্কা বাঁধ’ চালুর অর্ধশতাব্দী পার হয়েছে। ভারত ১৯৭৫ সালের ১৬ মে উজানে গঙ্গায় (বাংলাদেশে পদ্মা) পরীক্ষামূলকভাবে বাঁধটি চালু করে।
তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে হার মানে সেই মহতী উদ্যোগ। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক নদী পদ্মাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী অববাহিকা এক মৃতপ্রায় জনপদে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক ১৬ মে ‘ফারাক্কা লংমার্চ দিবস’ উপলক্ষে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম (banglanews24.com)-এর নিয়মিত আয়োজন ‘এডিটরস চয়েস’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা বাঁধ ও সম্ভাব্য পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত তুলে ধরেন। বাংলানিউজের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব আলম, সামরিক বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মোহসিনুল করিম এবং সিনিয়র সাংবাদিক ফকির শওকত।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের পটভূমি তুলে ধরেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু। তিনি বলেন, গঙ্গা নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে ভারত এক তরফাভাবে যখন ফারাক্কা বাঁধ দেয় তখন ১৯৭৬ সালের ১৬ মে লংমার্চের ডাক দেন মওলানা ভাসানী। তারও আগে ১৯৭৫ সালের ১৬ মে ফারাক্কা বাঁধ চালু হয়েছিল। গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হয়েছিল ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা নামক স্থানে। এরপরই আমাদের জাতীয় জীবনে এক অমানিশা-দুর্দিন নেমে আসে। আমাদের যে বিশাল পদ্মা নদী, আন্তর্জাতিক নদী—এই নদীটা প্রায় আস্তে আস্তে মৃত হওয়ার পথে চলে যায়। এই অবস্থায় আমরা দেখলাম যে সম্প্রতি ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
একতরফা পানি প্রত্যাহারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় নির্মিত হতে যাওয়া এই ‘পদ্মা ব্যারেজ’ হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইচ এবং দু’টি ফিশ পাস। ২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে নির্ধারিত এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের পাঁচটি প্রধান নদী—গড়াই, মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, বড়াল ও ইছামতীর পানি প্রবাহকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই ব্যারেজের মাধ্যমে বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে ওই নদীগুলোতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানির প্রবাহ নিশ্চিত করবে। এই সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুরসহ মোট ২৪টি জেলার প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে আধুনিক সেচ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে চলমান তীব্র পানিসংকট নিরসনের পাশাপাশি এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ বছর জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে এই প্রকল্প শেষ করা হবে। যার চূড়ান্ত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
আলোচনায় অতিথিরা যা বলেছেন
মাহবুব আলম: আজকে ফারাক্কা লং মার্চের ৫০তম বার্ষিকী, ৫০তম পূর্তির দিন। এই দিনে আমাদের একটা বিষয় চিন্তার মধ্যে আনতে হবে যে, ওই লংমার্চটা কেন করতে হয়েছিল এবং ওই লংমার্চের আমরা কী সুফল পেয়েছি? ফারাক্কা লংমার্চের পটভূমিটা কী ছিল? কারণ আপনারা জানেন যে গঙ্গা নদীর পানির প্রবাহ একতরফাভাবে আটকে দিয়ে ভারত পানি প্রত্যাহার করে যখন নেয়, সেই প্রেক্ষিতে মওলানা ভাসানী ৭৬ সালে ফারাক্কা লংমার্চের ডাক দেন। ভাসানী তো খুব নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় এই ফারাক্কা লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আমরা কী দেখলাম? কর্মসূচি ঘোষণার পর তিনি (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) ইন্দিরা গান্ধীকে একটা চিঠি লিখলেন যে ফারাক্কার প্রভাবে ভাটিতে যে পদ্মা, সেই পদ্মা শুকিয়ে যাচ্ছে। কাজেই গঙ্গার পানির ভাটির দেশের যে অধিকার, পানি পাওয়ার যে অধিকার, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে আপনি ব্যবস্থা নিন। ইন্দিরা গান্ধী জবাব দিলেন, কিন্তু কার্যকর কোনো কথা বললেন না। মওলানা ভাসানী আবার তাকে চিঠি দিলেন, তিনি উত্তরও দিলেন। এইভাবে পর পর তিনবার পত্র বিনিময়ের পর মওলানা ভাসানী দেখলেন যে— না, আমি যদি সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি এবং এই ফারাক্কা ইস্যুটাকে যদি আন্তর্জাতিকীকরণ না করা যায়, তাহলে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।
যদিও ওই মিছিলের স্লোগান ছিল—‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও ফারাক্কা’। আসলে তো ‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও ফারাক্কা’ স্লোগানটার মানে হচ্ছে প্রেসার তৈরি করা। কিন্তু আসল লক্ষ্য গঙ্গার পানির ওপর আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায়। এই ফারাক্কা লংমার্চের মধ্য দিয়ে পুরো জাতিকে মওলানা ভাসানী উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ১৯৭৬ সালে রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে যখন ফারাক্কা অভিমুখে মিছিল শুরু হলো, প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে এবং প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ মাঝখানে শিবগঞ্জে একদিন রাত্রিযাপন করতে হয়। সেই সময় লক্ষাধিক মানুষের এই মিছিল, যা বৃষ্টির মধ্যেও ছিল সুশৃঙ্খল। সেই নিরস্ত্র মানুষের মিছিলকে আটকানোর জন্য আমরা কী দেখলাম—সীমান্তর ওই পারে ভারত সৈন্য সমাবেশ করল। অর্থাৎ, নিরস্ত্র জনগণের ওপর ভারতের সশস্ত্র আক্রমণের পরিকল্পনা। তো এই যে বার্তাটা, মওলানা ভাসানী কিন্তু এখানে দুটো জায়গায় পুরো জাতিকে মেসেজ দিলেন যে আন্দোলন করতে হবে এবং ভারত এরকম করে দেয়াল দিয়ে দাঁড়াবে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে, প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হবে।
মওলানা ভাসানী কখনোই সরকার প্রধান ছিলেন না, এমনকি কোনো সরকারেরও প্রতিনিধি ছিলেন না। তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, সরকার তৈরি করেছেন, সরকার নামিয়েছেন, সরকার উঠিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী করেছেন, মন্ত্রী করেছেন। আসামে প্রধানমন্ত্রী করেছেন, বাংলাদেশে শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান আমলে।
এখানে প্রটোকলের কোনো বিষয় ছিল না। সারা দুনিয়াতেই প্রমিনেন্ট ব্যক্তি যদি হয়, সে সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতির অঙ্গনে বিখ্যাত ব্যক্তি যদি হন, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হন, তিনি যেকোনো ব্যক্তিকে চিঠি লিখতে পারেন। এতো গেল হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধী, মওলানা ভাসানী চিঠি লিখেছিলেন জওহরলাল নেহেরুকে, তখন নেহেরু প্রধানমন্ত্রী ছিলে। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে, কাগমারীতে তার যে গ্রামের বাড়ি যেখানে সেখানে একটি সম্মেলন হয়েছিল। সেই সম্মেলনে মওলানা ভাসানী নেহেরু, মিশরের জামাল আব্দুল নাসেরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের চিঠি লিখেছিলেন। তারা কিন্তু উত্তর দিয়েছিলেন, অনেকে এসেছিলেন অনেকে আসেননি।
মওলানা ভাসানী যখন দেখলেন যে, গঙ্গার পানি আসছে না, পদ্মার পাড় শুকিয়ে যাচ্ছে, আশপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষি কাজের ক্ষতি হচ্ছে তখন মওলানা ভাসানী বাধ্য হয়ে চিঠি দিলেন।
মোহসিনুল করিম: আমার যতটুকু মনে পড়ে আমি ওই লংমার্চে গিয়েছিলাম। আমি রাজশাহী পর্যন্ত যখন যাই, তখন বৃষ্টি হতে লাগলো। এ কারণে আমি থেকে গেলাম, আর যাইনি। আরেকটা লংমার্চে আমি গিয়েছিলাম, সেটা ছিল দহগ্রাম আঙ্গপোতার একটা লংমার্চ, শফিউল আলম প্রধানের সঙ্গে। আমি বর্ডার পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তখন আমি দেখছি বর্ডারে বিএসএফের কী প্রস্তুতি। আমি শুনেছি ফারাক্কার ব্যাপারেও তাই হয়েছিল যে, ওরা এমনভাবে ফোর্টিফাইড করেছিল যে, কোনো লোক ওদিকে গেলে তাকে মেরেই ফেলবে।
মওলানা ভাসানী তো উপমহাদেশের একজন খুব সিনিয়র একজন পলিটিশিয়ান, আমার মনে আছে তখন আমি ইত্তেফাক পড়তাম। সে সময় তিনি (ভাসানী) লিখেছিলেন প্রথম চিঠিতে- যে দেখো, আমি তোমার বাবার সঙ্গে পলিটিক্স করেছি আবার গান্ধীজির সঙ্গে করেছি। তিনি তো গণপরিষদের মেম্বার ছিলেন আসামে। কংগ্রেস লিডার ছিলেন, গান্ধীও তো কংগ্রেস লিডার। এই একটা যোগসূত্র ছিল, উনি কিন্তু এটার রেফারেন্স দিয়ে চিঠিটা লিখেছেন। আমার মনে আছে ওই চিঠিটার ভাবসংক্ষেপটা ছিল সে সময়ের পত্রিকায়। এভাবে উনি লিখলেন এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশের থেকে কিছু করা যায়নি, কারণ আমাদের সে সময়কার সরকারে যিনি ছিলেন উনি নিজেই দুইবার অনুমতি দিয়েছেন, একবার হচ্ছে ৪০ বা ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলক শুরু করতে হবে, এটা কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ফারাক্কা ব্যারেজটা চালু করতে। পানি বন্ধ করে আটকে দেবে।
ওই যে ৪১ দিনের জন্য শুরু করছে আর বন্ধ করেনি। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ হয়, তখন কিন্তু দিল্লিতে আমাদের শেখ সাহেব গিয়েছিলেন। তার সাথে পানিসম্পদ সেক্রেটারি গিয়েছিলেন আসাফ উদ দৌলা। আমি উনার টকশোতে দেখছি। উনি বলছেন যে আমি গেলাম, ইন বিটুইন দি মিটিং আমি ওনাকে প্রাইম মিনিস্টার তো আমাকে চিনতেন, ইন্দিরা গান্ধী। ওনার কাছে যাইয়া বললাম যে ম্যাডাম, আপনি যদি আমাকে একটু সুযোগ দেন একটু ছবি তুলি। এই ফাঁকে সে জিজ্ঞেস করছে একটা প্রশ্ন। প্রশ্নটা হলো যে, ম্যাডাম আমরা যদি পাকিস্তানের অংশ থাকতাম এই সময় তাহলে কি আপনি এটা (ফারাক্কা বাঁধ) ওপেন করতে পারতেন? উনি বলছে যে, নেক্সট কোশ্চেন।
তো বলছে আমরা যদি ভারতের অংশ থাকতাম তাহলে কি পারতেন? বলছে লেট আস গো ফর দি মিটিং।শেখ সাহেব তো প্রথমে ৪১ দিনের জন্য অনুমতি দিলেন, যে এটা পরীক্ষামূলক দাও। তো উওনারা সেক্রেটারি মানুষ, তারা কিছুটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করে দিয়েছে এটা পরীক্ষামূলক দেওয়া হলো। কিন্তু ওরা তো আর ইয়ে করে নাই। কিন্তু পরের বার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কা ওপেন করল তখন সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছে, অনেক কিছু হয়েছে। আমাদের দেশ থেকে পানিসম্পদ সেক্রেটারি গিয়েছিলেন, আরও দুই একজন। কিন্তু ওনাদের শেখ সাহেব কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন।
জানা গেছে, এই ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনা অনেক আগেই ছিল এবং এটা শুরু হয়েছিল ৬২ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অর্থাৎ পাকিস্তান ভেঙে গেলে এই বাঁধটা চালু হয়। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং মানুষের জীবিকারও পরিবর্তন ঘটল। জেলেরা অনেকে মাছ চাষ ছেড়ে দিল, মাছ ধরা বন্ধ করে দিল এবং নানা পেশায় ঢুকে গেল।
ফকির শওকত: আমার গ্রামের বাড়ি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার একটি গ্রামে, মধুমতী নদীর পাড়ে। আমি যে মধুমতী ফারাক্কা চালু হওয়ার আগে দেখছি, সে মধুমতী বর্ষাকালে ছিল ভয়ংকর। পলি পানিতে সয়লাব হয়ে যেত চারিদিক। সেই মধুমতী, তার স্রোত ছিল ব্যাপক। সেখানে নৌকাডুবি ঘটত। লঞ্চ, স্টিমার স্রোতের কারণে চলতে পারত না, বর্ষাকালে সেই নদী ছিল এত প্রখর। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর তা আস্তে আস্তে একটা মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে।

আমার উপজেলার ওপর দিয়েই লোহাগড়া বাজারের পাশ দিয়েই একটি নদী আছে নবগঙ্গা। এই নদীতেও আমরা যথেষ্ট স্রোত, বর্ষাকালে যথেষ্ট নৌকা, মাঝি, মাছ ধরার নৌকা, বড় বড় বাণিজ্যিক নৌকা চলতে দেখেছি। আমার জেলার ভেতরে চিত্রা নদী। এই নদীতে আমি লঞ্চে চড়েছি। বহু দূর পর্যন্ত লঞ্চ যেত। এখন কোনোটাই আর চলে না। ফারাক্কার প্রভাব কী, আমি সংক্ষেপে দুটি কথায় বলে দিলাম।
আমাদের বাড়ির সামনে ইছামতী বিল। দৈর্ঘ মহম্মদপুর উপজেলা থেকে লোহাগড়া পর্যন্ত। এই বিলে বর্ষাকালে অঢেল পানি থাকত। ব্যাপক পানি, সেখানে ব্যাপক মাছ, পাট জাগ, ধান-ফসলে ভরা থাকত। আবার বর্ষাকালে অনেক সময় বন্যায় ডুবে যেত। এখন সেসব কোনো কিছু আর নাই। এমন একটা পরিবর্তন, নৌ-চলাচলের কোনো ব্যবস্থা আর নেই। এখন ভ্যানে, রিকশায় আর বর্তমানে তো মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার—এইগুলোয় মানুষ চলাচল করে। পুরো নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা যা ছিল, সবগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ৫০ বছরের পরিবর্তন এইটাই।
আর কৃষিতে তো ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। কৃষিতে আগে যে ধরনের ফসল উৎপাদন হতো, সেই সমস্ত অনেক ফসলের অস্তিত্বই এখন বিলীন হয়ে গেছে। আর মাছের যে বৈচিত্র্য ছিল আমাদের অঞ্চলে, সেগুলোও এখন আর নেই। কারণ পানির স্রোতের সঙ্গে মাছের ডিম পাড়া এবং এই ডিমের থেকে বাচ্চা ফোটার একটা সম্পর্ক আছে। নদী থেকে মাছের ডিমগুলো যখন খাল দিয়ে বয়ে বিলে যেত, তখন চারপাশের বিলে এই ডিম যাওয়ার ফলে আর মাছের পোনা যাওয়ার ফলে চারদিকে মৎস্যের প্রজনন ক্ষেত্র বাড়ত। এ সবকিছু কিন্তু এই ৫০ বছরে ধ্বংস হয়ে গেছে। এজন্য শুধু যে ফারাক্কা দায়ী, এ কথাটা বললে পরে কিছুটা সত্যের অপলাপ হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ফারাক্কার ইফেক্টের কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে যে সমস্ত বাঁধ এবং স্লুইচগেট দিয়ে নদীর সঙ্গে খালকে যেভাবে বিভক্ত করে ফেলছে, এবং বর্ষাকালে নদীর পানি খালে যাওয়ার খালের ভেতর দিয়ে বিলে যেয়ে যেভাবে মৎস্য সম্পদ বা পলিমাটি যেত, সমস্ত রাস্তাগুলো যেভাবে বন্ধ করছে স্লুইচগেট দিয়ে, তার ফলে আমাদের এই বৃহত্তর অঞ্চলে এখন... পুরো আগের যে ভূমি ব্যবস্থা, আগে যে প্রাকৃতিক যে ব্যবস্থাটা ছিল, সমস্ত ব্যবস্থাটাই মার খেয়ে গেছে।
বলা চলে যে, আমি আমার ছোটবেলায় যে দেশ পেয়েছিলাম, আজকে এই ৭০ বছরের বয়সে এসে আমি দেখছি একটা ভিন্ন দেশ, ভিন্ন একটা প্রকৃতি। যে প্রকৃতির চেহারাটা আমার কাছে এখন খুব অপরিচিত।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: ফারাক্কা বাঁধের কারণে আমরা এটাও শুনেছি যে ওই পাশে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং বিহার পর্যন্ত গঙ্গা নদীর যে তলদেশ, সেটাও উঁচু হয়ে গেছে এবং ওখানেও অনেক বন্যা হয়। অন্যদিকে একই কারণে বাংলাদেশেও আমরা দেখি বর্ষা মৌসুমে যখন স্লুইচগেট ছেড়ে দেয়, ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেয় তখন বন্যায় বাংলাদেশ প্লাবিত হয় আর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ মরুভূমিতে রূপান্তরিত হয়। ইতোমধ্যে আমরা দেখলাম যে এই সরকার, নতুন সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের একটা উদ্যোগ নিয়েছে, ৩৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং পদ্মা নদীর এই পাশে আরেকটা ব্যারেজ দেবে যেটা বাংলাদেশের অংশে, প্রায় ২০০ কিলোমিটার এ পাশে এসে একটা ব্যারেজ দেবে। এখন ওই পাশে আমরা দেখলাম যে নদী একটা ব্যারেজে শুকিয়ে গেল, এপাশে যদি আবার একটা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয় তাহলে কী হবে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই পদ্মা এবং ওপাশে গঙ্গা, এই গঙ্গা এবং পদ্মার ভবিষ্যৎটা কোন দিকে? আপনি কিভাবে দেখছেন?
ফকির শওকত: আমি একটা কথাই বলতে চাই, এই যে আমাদের বাংলাদেশ আর এই বাঙালি জাতির যে রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পেছনে আমাদের যে স্লোগান ছিল—‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’। এই নদী দিয়েই কিন্তু আমরা স্লোগান দিয়ে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। নদীর সাথে আমাদের সম্পর্ক যে ভূমির সম্পর্ক। যমুনার পলি, ব্রহ্মপুত্রের পলি, মেঘনার পলি আর পদ্মা ও গঙ্গার পলি পড়েই এই ভূমি গঠিত হয়েছে। এই যে বিশাল বদ্বীপ অঞ্চল বলি, পুরোটা হচ্ছে নদীর উপহার। সেই নদীতে যখনই আমি বাঁধ দেই, আর ভারত বাঁধ দিক না কেন, তাতে ভূমি গঠনের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমি যখন থেকে একটু একটু করে সাংবাদিকতা করতে শুরু করি, তখন থেকে আমি দেখছি যে কোনো নদীতে সেতু করা হলে সেই নদীটার মৃত্যু ঘটে; নদীর ওপরে যখন কোনো স্লুইচগেট করা হয়, সেই নদীর মৃত্যু ঘটে।
আমার বাড়ি যশোরে, সেখানে ভবদহ বলে একটা বিল আছে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প ছিল। টেকা নদী বলে একটা খরস্রোতা নদী ছিল, তার ওপরে স্লুইচগেট করে ভবদহে। এই স্লুইচগেট করার উদ্দেশ্য ছিল যে ওখানে যাতে নোনা পানি ঢুকে বিল নষ্ট না হয়, মানুষ ফসল পায়—সেজন্য কিন্তু এই স্লুইচগেট করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেই স্লুইচগেটের ভয়াবহ ইফেক্ট পড়েছে এবং যেখানে স্লুইচগেট করা হয়েছে সেই জায়গাটা ভরাট হয়ে গেছে। এর উজানে যত জায়গা আছে, বর্ষাকালে যত পানি আসে, সমস্ত পানি জমে যায়।
এ নিয়ে বহু আন্দোলন হয়েছে এবং এমনকি মানুষও মারা গেছে। ভবদহের একটা স্লুইচগেটের কারণে ওই গোটা অঞ্চল বছরের পর বছর পানির তলে চলে গেছে। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই, নদী মারা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যত জায়গায় স্লুইচগেট করছে, প্রতিটা জায়গায়ই কিন্তু সমস্ত খাল এবং নদীগুলো শুকায়ে পানি নিষ্কাশন সমস্ত ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে।
আমি এই আশঙ্কা থেকেই বলি, পদ্মা নদীর ওপর আর একটা ব্যারেজ দিলে তার প্রভাব নিশ্চিতভাবে আজকে পদ্মার যে অংশটা এখনো দেখা যায়, এই অংশটা আগামীতে ভূগোলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না, মানচিত্রে পদ্মা নামে একটি নদী থাকতে পারে।
মাহবুব আলম: আমি ফকির ভাইয়ের সঙ্গে একমত। এখনকার নদীবিজ্ঞানীরা কিন্তু এই কথাই বলছেন যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে অব্যাহত রাখতে হবে। নদীকে প্রতিরোধ করলে, অর্থাৎ প্রকৃতিকে বাধা দিলে বরং ক্ষতিই হচ্ছে।

যেমন আপনারা জানেন যে ফারাক্কা যখন বাঁধ দেওয়ার প্রস্তাবটা আসে এবং প্রথম এই ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার বা ব্যারেজের যাকে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একজন ইঞ্জিনিয়ার, তিনি বাঙালি ছিলেন ভারতে। তিনি এই দায়িত্ব নিতেই অস্বীকার করেন। তিনি কিন্তু আইএএস অফিসার ছিলেন। দায়িত্ব নিতেই অস্বীকার করেন, তিনি বলেন যে এইটা করার ফলে ভারতের কোনো লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হবে। তো আসলেই ক্ষতি হয়েছে।
বিহারের মুখ্যমন্ত্রী গত বছর বা তারও আগের বছর বলেছে, এই বাঁধটা ভেঙে দাও। কারণ এই বাঁধের ফলে বিহার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি নিচ্ছে, কথা ছিল যে গঙ্গার এই যে ব্যারেজটা করল, এইটা পানি নিয়ে ভাগীরথী নদীর সমুদ্রের ওখানে যে বন্দর আছে, বন্দরে নাব্যতা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু এতে খুব লাভবান হয় নাই।
আমি মনে করি, ফারাক্কা তৈরি করা হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। তৎকালীন পাকিস্তানের সঙ্গে যে বৈরিতা অর্থাৎ পাকিস্তানকে সাইজ করার জন্যে। কিন্তু এখন তো পাকিস্তান নাই, এখন বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশ সাইজ হচ্ছে। তাহলে আমাদের বিকল্পটা কী?
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: ভারতও তো নিজে সাইজ হয়ে গেছে…
মাহবুব আলম: ভারত কতটা সাইজ হয়েছে জানি না, কিন্তু আমাদের তো বিকল্প নাই। আমাদের এই ব্যারেজটা করতে হবে। আমার যতটুকু জানা আছে, ১৯৬৪ সালে যখন ফারাক্কা ব্যারেজের ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ শুরু হয়, মওলানা ভাসানী ৬৫ সালে আইয়ুব খানকে চিঠি লিখে প্রথমে জানাইছিলেন, পরে সভা-সমাবেশ করে বলেছিলেন যে, ‘আইয়ুব খান, ওরা ব্যারেজ করছে, এটা ঠেকাও। যদি না পারো, পাল্টা পদ্মা ব্যারেজ করো।’
আইয়ুব খান তার উত্তরে বলেছিল, ‘এত টাকা আমার নাই।’ আমার মনে আছে মওলানা ভাসানীর উত্তর ছিল, ‘পাটের টাকা কোথায় যায়?’
তো কাজেই ফারাক্কার বিকল্প এই ব্যারেজের যে উদ্যোগটা নেওয়া হয়েছে, আমি মনে করি অনেক বিলম্বিত উদ্যোগ।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: কিন্তু এটা আপনি বলছেন যে বিলম্বিত উদ্যোগ। যদি এটা বাস্তবায়ন হয় তাহলে পদ্মা নদী আরেকবার মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা তো নদীকে একটা জীবন্ত সত্তা হিসেবে...
মাহবুব আলম: আমি একমত। কিন্তু এখন আমার তো কৃষিকাজটা করতে হবে। এইটাতে যেটা হবে, এই পদ্মা ব্যারেজ করলে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ এখানেও আরেকবার বাধা পাবে। আমার ভূমি গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: পদ্মা সেতুর পিলারের কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চর জেগে উঠছে...
মাহবুব আলম: চর জেগে উঠছে, নদী ভাঙন হচ্ছে। শরীয়তপুর পুরাটা নদীর মধ্যে চলে গেছে।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: এবং নদী নদীর গতিপথও কিন্তু অনেকটা বদলে গেছে। ইতোমধ্যে বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে। এমনকি যমুনা সেতুরও একই ফল। পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে আসলে কতটা লাভ বা লোকসান এটা কিভাবে দেখছেন? মানে আসলে যৌক্তিকতা...এটা কি একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা দিয়ে একটা প্রাকৃতিক নদীকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
মাহবুব আলম: না, কিন্তু এখানে আমাদের বিকল্প নেই। এখানে আমাদের এটা করতে হবে, কৃষিকাজ করার জন্য।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: বিকল্প আছে কিনা আমরা কি আরও গবেষণা করতে পারি নদী গবেষকদের দিয়ে?
মাহবুব আলম: আমার মনে হয় এ যাবত এগুলো কিন্তু গবেষণা করেই করা হয়েছে।
মোহসিনুল করিম: এই ব্যারেজের উদ্যোগটা ১৯৭৬ সালের পরপরই আমরা শুনেছি, পেপারেও দেখেছি তখন, আমার ভালো করে মনে আছে। আসলে একটা নদী হলো একটা জীবন্ত সত্তা এবং এই নদী কিভাবে প্রবাহিত হবে, কোথা দিয়ে প্রবাহিত হবে—এগুলো কিন্তু হাইড্রোলজিক্যাল ট্রেন্ড, গ্র্যাভিটেশনাল পুল, তারপরে মাটির গঠন, ওই জায়গার ভূমির গঠন—এইগুলোর উপর ভিত্তি করে নদী প্রবাহিত হয়। আপনি নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটে যদি যান, দেখবেন ওরা যমুনা নদী যত ডিসটেন্স ট্রাভেল করছে, ওই জায়গার প্রত্যেকটা মাটির সাথে মিলিয়ে সেই ল্যান্ড তৈরি করা, সেখান দিয়ে তারা পানি ছেড়ে দিয়ে দেখে যে কোথায় নদী কোন বছর কী হয়।
নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট কিন্তু কাজ করেছে, কিন্তু আমাদের যে মূল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সমস্যাটা হয়, সেটা হলো যে আমরা ওই সময়ের ওপর ভিত্তি করে এটা করছি। তারপরে তো ইন্ডিয়া এমন কোনো নদী নাই বাঁধ দেয় নাই। তাহলে সেই প্রবাহটা তো আর নাই। আমি কিন্তু আগের প্রবাহের ওপর চিন্তা করে এগুলো করছি।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: অর্থাৎ গঙ্গার পানিতে তারা বিভিন্ন ক্যানেল দিয়ে সরিয়ে নিয়েছে? পুরো দেশে...
মোহসিনুল করিম: হিমালয় গঙ্গোত্রী থেকে যে উৎপত্তি, তার বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে পানি সরিয়ে নিয়ে ফারাক্কা পর্যন্ত আসতে আসলে...
মাহবুব আলম: অন্তত ১০টা ব্যারেজ করেছে তারা, ১০টা।
মোহসিনুল করিম: তারপরে তো অনেক...
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: আমরা দেখি যে এখন চুক্তির এই বছরই শেষ হয়ে যায়, প্রায় ডিসেম্বরের দিকে বোধহয় চুক্তির, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে চুক্তি ছিল গঙ্গা ব্যারেজের চুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজের চুক্তি শেষ হয়ে যাবে, হ্যাঁ।
এক্ষেত্রে আসলে আমরা এ পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী পানি এসেছে কিনা, সেই হিসাবটা আমরা সঠিকভাবে জানি না। আর আদৌ চুক্তি অনুযায়ী পানি দেয় কিনা...
মাহবুব আলম: না, পানি আসে নাই এবং দেয়ও নাই। এটা আমরা জানি।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: সেই কারণেই বোধহয় ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ?
মোহসিনুল করিম: না না, এটা তো বলাই হচ্ছে যে আমরা খাতা কলমে এটা একটা আছে, আসলে না। আমি নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের যে মিটিং হয়, আমি ইনডাইরেক্টলি একটা মিটিংয়ে ছিলাম। তো ওইখানে দেখলাম যে আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা যেভাবে কথা বলে, ওদের কিছু লিকার-টিকার খাওয়ায়ে দেয়, ধরায়ে দেয়, তারপরে কথাবার্তা। তো আমি গেছি জাস্ট অবজার্ভার হিসাবে। একটা জায়গায় বসছি ওইখানে।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: তারা তাহলে ভারতীয়দের সুরে সুর মিলিয়ে চলে আসে?
মোহসিনুল করিম: হ্যাঁ, আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম যে এটা কীভাবে সম্ভব হলো! অনেক বছর আগের কথা...
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: কম পানি পেলেও ঘুষের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আসে বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়াররা...

মোহসিনুল করিম: আছে, এরকম কথাও বলে। ফারাক্কার ইফেক্ট আমি নিজে দেখেছি, আমার বাড়িটাই হলো পদ্মার পাড়ে। পাবনা জেলায়। ওইখানে আমার গ্রামেই প্রায় এক থেকে দেড়শো জেলে পরিবার ছিল। একজনও নাই আর এখন। সবাই চলে গেছে ভারত। ওই দিকে মাছ মারছে। এখানে তো মাছ মারার পানি নাই, কোথায় মারবে? যারা ছিল তারা পেশা পরিবর্তন করে ফেলছে। আর একটা আছে যে, আসলে কী হতো? পলি পড়ত। আমি তো আমার গ্রামে আশেপাশে কোথাও দেখিনি বর্ষা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই কাউকে হাল চাষ করতে। জাস্ট রবিশস্য মাসকলাই অন্যান্য কালাই বুনে দিত এবং ওই মাটিটা আমরা বলি জো আসা, মানে নাঙল চালানোর মতো হইতেই একটা শস্য তুলে ফেলতে পারত মানুষ। আপনি দেখেন, ওইখানে কিন্তু লেবার লাগে না, কিচ্ছু লাগে না। এটা তো আমি নিজে দেখছি।
তো এখন তো আর এই কালাইয়ের উৎপাদন হয় না। তো এই যে একটা অ্যাডিশনাল ফসল পেত চাষিরা কোনো সার ছাড়াই... সেই পলিটা আর আসে না, পানি আসে না। আর এই যে আপনি স্লুইচগেটের কথা বলছেন, এটা আমি নিজে দেখছি আমার ওইখানে অনেক বড় একটা বিল আছে, বিল গণ্ডহস্তী বলে। গজনা বিল, পাবনা জেলার অনেক বড় একটা বিল। ওই বিলেও এরকম স্লুইচগেট হওয়ার পরে বিলে ওই বড় মাছও পাওয়া যায় না, বিলের মধ্যে সেভাবেও আর ফসল উৎপাদনও হয় না। তো ফারাক্কার ইফেক্ট আমি আমার গ্রামে যারা দেখছি, এখন মরুভূমির মতন হয়ে যাওয়াতে কী হইছে? এই যে বাতাস আসে, আমার গ্রামের বাড়িঘরের মধ্যে পর্যন্ত এই বালু। আমি মরুভূমিতে ছিলাম প্রায় আড়াই বছর তিন বছর। ওই সময় যেরকম দেখছি যে বাতাস উঠলে গাড়ি বন্ধ করে এমনভাবে থাকতে হয় যে...
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: তার মানে আপনি যেটা বললেন যে ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশ মরুকরণ হয়েছে এবং তার প্রভাব আমরা সরাসরি দেখছি...
মোহসিনুল করিম: আর একটা জিনিস হলো কী যে ফারাক্কা যে প্ল্যান করা হয়েছে, ওই যে আমি প্রশ্নটার উত্তর যেটা বললাম আপনাকে, ফারাক্কা প্ল্যান করা হয়েছে যে এমন সময় ফারাক্কা ওপেন করব, ৭১-এ কিন্তু ফারাক্কার কাজ শেষ হয়েছে। ৭১ কেন? র-এর পরিকল্পনায় যে এটাকে লিকুইডেট করতে হবে এই দেশটাকে, যখন পাকিস্তান থাকবে না। পাকিস্তান থাকলে তো এটা নিয়ে তো সমস্যা হতো। আইয়ুব খান কিন্তু ধমক দিয়েছেন যে, তোমরা করতেছ, আমি কিন্তু বোম মারব।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: আমরা দেখলাম যে সম্প্রতি সিন্ধু নদীর পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী একটা যুদ্ধ হলো এবং পানি প্রত্যাহার করে নিল।
মোহসিনুল করিম: এখনকার ব্যারেজের পরিকল্পনা অনেক পুরনো। এখন যেটা বলছে, এখন পেপারেই তো আসতেছে যে হ্যাঁ, ঠিক আছে টাকা যেটা খরচ করছ এটা কিন্তু ১০ পার্সেন্টও না, এই ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এটা তো একটা বেড়া দেওয়া। কিন্তু এটা ম্যানেজমেন্ট, ওনারা তো চাচ্ছে এই নদীর এখান থেকে ১৬০ কিলোমিটার জায়গা সোজা অনেক ড্রেজিং করবে পানি রিজার্ভ করার জন্য। কিন্তু যখন ওপর থেকে পানি আসবে, তখন তো ওই ড্রেজিংটা ওই অবস্থায় আর থাকবে না। তার মানে মেইনটেনেন্স কস্ট প্রতি বছর যে পরিমাণ লোড হবে, কৃষি দিয়ে সেটা ভরণ মানে পোষাবে কিনা আমি জানি না। কৃষক পর্যায়ে হয়তো...
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: ব্যারেজটা আসলে আরেক ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে। বিকল্প পরিকল্পনাই বা কি হতে পারে?
ফকির শওকত: ফরিদপুরে নদী গবেষণা কেন্দ্রে আমি রিপোর্টিং করার জন্যই গিয়েছিলাম। তখন এই পদ্মা ব্যারেজ করলে আমাদের কী লাভ হবে তা নিয়ে একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার আমাকে বললেন, এই ব্যারেজ করার ফলে এখানে যে পলি জমবে, তা যদি না সরানো হয় এক বছর, তাহলে এই নদী আর কখনোই আগের অবস্থায় নেওয়া যাবে না। ব্যারেজ করা মাত্রই ভয়াবহ একটা বিপর্যয় হবে।
আপনাদের বোঝার জন্য আমি একটা কথা বলছি, নদীটা যদি আমি ফারাক্কা পয়েন্টে ধরি, এটা সমুদ্রের পৃষ্ঠা থেকে কত উপরে? এই নদীটা বয়ে যখন এই যে আমাদের রাজবাড়ীর পাংশা এখানে যখন আসবে, আপনি যে জায়গায় বাঁধটা দিচ্ছেন, বাঁধ দেওয়ার ফলে আপনার কতটুকু জায়গায় পানি সংরক্ষণ হবে? কারণ ওখানে যে পরিমাণ উচ্চতা অটোমেটিক্যালি কিন্তু একটি বিশাল অংশে কোনো পানি রিজার্ভার হবে না। পানি রিজার্ভ হয়ে থাকবে একদম বাঁধের কাছাকাছি অঞ্চলে, পাংশা অঞ্চলের কিছুটা অংশে। এটা তো যে রিজার্ভের কথা বলছে, ফারাক্কার পয়েন্ট থেকে এই পর্যন্ত এটা তো কোনোভাবে রিজার্ভ সম্ভব না। নদী তো বহমান থাকে।
সেটার হাইটের জায়গা যখন বর্ষাকালে আসবে, শুষ্ক সময়ে বাঁধটা দিয়ে দেবেন, দিয়ে যখন পানি সরানো বন্ধ করে দেবেন তখন তো একটা লিমিটেড জায়গা থাকে। টোটাল নদীতে কিন্তু কোনো পানির রিজার্ভেশন হবে না। যে কথা ইঞ্জিনিয়াররা বলতেছে যে, ওপরের নদীতে তাহলে অসংখ্য বাঁধ দেওয়া লাগবে। একটা বাঁধ না, প্রতিটা নদীর যেসব নদীর কথা বলা হয়েছে সেই নদীর সামনে একটা করে বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করা লাগবে।
আমার বিকল্প প্রস্তাব আছে। আর একটা কথা আমি বলে নেই, মাহবুব ভাই যেটা বলছেন যে, সে সময় লংমার্চের সময় যে স্লোগানটা ছিল, আমি যে স্লোগান দিয়ে ফারাক্কা মিছিল করেছি, আমি নিজেও যদি সে একই কাজ করি তাহলে কিন্তু আমি...আমার স্লোগানের জায়গায় কিন্তু থাকছি না। আমি একটা ব্যারেজ দিয়ে ওই স্লোগান থেকে সরে আসলাম।
আর একটা কথা হচ্ছে যে, ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত এ নিয়ে এখনো দরকষাকষির যে সুযোগ আছে, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের এই বার্গেনিং পয়েন্ট কিন্তু শেষ হয়ে যাবে। ফারাক্কা নিয়ে কথা বলার সুযোগ বাংলাদেশ চিরতরে হারাবে। যেহেতু বিহারের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করছেন, আরও ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওখানকার আরও রাজনৈতিক লিডাররা দাবি তুলবেন, ওখানে একটা দাবি উঠবে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে।
আমার বিশ্বাস, আমাদের একটু সময় অপেক্ষা করা উচিত এবং সামনে যেহেতু ডিসেম্বর মাসে আসছে, এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন সারা বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে বা বিহারের মানুষকেও যদি আমরা অর্গানাইজ করতে পারি ফারাক্কার বিরুদ্ধে, সেই এই পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত। তারপরে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: আপনি বলছিলেন যে বিকল্প, ব্যারেজের বিকল্প কী হতে পারে?
ফকির শওকত: আমরা যদি সত্যি সত্যি পানি রক্ষা করতে চাই, তাহলে বর্ষাকালে যখন পানি আসে, তখন নিরাপদ দূরত্বে মাটি কেটে কিছু রিজার্ভার আমরা করে রাখতে পারি। সারা বছর সেখানে পানি থাকবে এবং সেখান থেকে সেচ ব্যবস্থা চালু রাখতে পারি। রিজার্ভারে আমরা মাছের চাষ করতে পারি...
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: সেই রিজার্ভার করতে গেলে তো ওইদিকে বাঁধ লাগবে না দেওয়া?
ফকির শওকত: না, রিজার্ভারটা আমরা প্লেইন ল্যান্ডে করব। তখন অটোমেটিক্যালি তার চারিপাশ দিয়ে পাড় তৈরি হবে। আর সেই রিজার্ভারগুলো আমরা মৎস্য চাষে ব্যবহার করতে পারি, তার পাড়ে গাছ লাগাতে পারি। অনেকভাবেই আমরা এই পানির বিকল্প ব্যবস্থাপনা করতে পারি।
মোহসিনুল করিম: পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে পরিকল্পনা শুনেছি, সেখানে পলি ম্যানেজ করার বিষয়ে বলা হয়েছে, যখন ওদের গেট ছেড়ে দেবে ফারাক্কা, এ গেটও ছাড়া থাকবে। আর এই ব্যারেজটা করা হচ্ছে নদীর থেকে অনেক বড় করে। ওই সময় যদি ছেড়ে দেওয়া হয় যে সিল্টটা আসবে উপর থেকে, সেটা পানির সাথে চলে যাবে। তারপরে আরেকটা জিনিস যেটা সেটা হলো যে, অন্যান্য নদীতে যে পানিগুলো ছাড়া হবে, উনি যেটা বললেন, ওই নদীতে ছাড়ার আগে এটাকে বলে ‘সিল্ট ট্রাপ’। একটা জায়গায় ওটা একটা রিজার্ভারে ওখানে থাকবে, সেডিমেন্টেশন হয়ে ফ্রেশ ওয়াটারটা শুধু ওই সমস্ত নদীতে যাবে। এটা হলো সাইন্টিফিক যে ম্যানেজমেন্টটা, তো তারপরেও কথা হলো কী যে, আমরা যে পরিকল্পনাই নিয়ে করি না কেন আসলে বাস্তবতায় যে অনেক কিছুই আসবে যেগুলো এই পরিকল্পনায় তো ধরাই হয় নাই। সেজন্যই বলা হচ্ছে যে এটার ম্যানেজমেন্টে খরচ হবে এর থেকে অনেক অনেক বেশি এবং এটা প্রতি বছরে হবে।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: সেটা বাজেটের সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ?
মোহসিনুল করিম: ব্যারেজ করার খরচ পাঁচ-ছয় হাজার কোটি করে করে সাত বছরে হবে। তারপরে প্রতি বছরেও ওইরকম পাঁচ হাজার সাত হাজার কোটি করে খরচ করতে হবে, তা না হলে নদীকে জীবিত রাখা যাবে না।
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: অর্থাৎ একটা মৃত নদীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি...
মোহসিনুল করিম: শুধু তাই না, এই ব্যারেজের আট-দশ কিলোমিটার দূরেই হলো যমুনা নদী। এই জায়গাটা মরুভূমি হয়ে গেলে ওই নদীর কী হবে?

তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু: এটা একটা বড় আলোচনা এবং বড় বিতর্ক। আমরা ব্যারেজের দিকে যাব নাকি রিজার্ভার তৈরি করে পানি ধারণ করব, সেই বিষয়টা নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া দরকার। এই ব্যারেজটা আমাদের জন্য কতটা উপকারী হবে, কতটা আমাদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, বড় নদী পদ্মা নদীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের বিকল্প বিকল্প কী ব্যবস্থা আছে, সেটা ভাবতে হবে। সেই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নদী যে বিষয়গুলো আইন আছে, সেই জায়গায় আমাদের অবস্থান কী হওয়া দরকার—এই বিষয়গুলো আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
মওলানা ভাসানীর ডাকে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের পটভূমি
১৯৬২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে ১৯৭৫ সালের ১৬ মে থেকে ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর অনুমতি দেন তৎকালীন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় বাংলাদেশের পানি সম্পদ সচিব আসাফ উদ দৌলাসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এতে আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত এটি পরীক্ষামূলক হিসেবেই চালু করা হয়। কিন্তু ভারত ওই ৪১ দিন পার হওয়ার পরও একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং স্থায়ীভাবে বাঁধটি পুরোপুরি চালু করে দেয়।
এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক নদী পদ্মাসহ এর শাখা নদীগুলো শুকিয়ে মরুকরণের দিকে যেতে থাকে। এই জাতীয় সংকটের মুখে তৎকালীন কোনো সরকার প্রধান বা সরকারি প্রতিনিধি না হয়েও আজীবন সংগ্রামী মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে ভাটির দেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে পরপর তিনটি চিঠি লেখেন। (উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসেরসহ বিশ্বনেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ছিল)। ইন্দিরা গান্ধী মওলানা ভাসানীর চিঠির উত্তর দিলেও পানি ছাড়ার ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
যখন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কোনো সমাধান এলো না, তখন এই সংকটকে আন্তর্জাতিকীকরণ এবং ভারতের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ‘লংমার্চ’-এর ডাক দেন।
১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দান থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার এক ঐতিহাসিক ও সুশৃঙ্খল মিছিল শুরু হয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও লক্ষাধিক নিরস্ত্র মানুষ দেশের পানির অধিকার রক্ষায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। মাঝপথে শিবগঞ্জে একদিন রাত্রিযাপন করতে হয়। এই নিরস্ত্র জনগণের মিছিলকে ভয় পেয়ে এবং আন্দোলন দমাতে ভারতের তৎকালীন সরকার সীমান্তের ওপারে বিপুল সৈন্য সমাবেশ ও সামরিক ফোর্টিফিকেশন করেছিল। মওলানা ভাসানী এই লংমার্চের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দুটি বার্তা দিয়েছিলেন—ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন জারি রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে যেকোনো সশস্ত্র বাধার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যদিও ‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও ফারাক্কা’ স্লোগানটি ছিল মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যার মূল লক্ষ্য ছিল গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা।