সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রচণ্ড ভিড়ে থরথরিয়ে কাঁপছিলেন রুবেল মিয়া। কোলে জ্বরাক্রান্ত শিশুসন্তান। চোখেমুখে ক্লান্তি ও উদ্বেগ। বোঝার বাকি রইল না যে, সন্তান হারানোর শঙ্কায় তিনি কাতর। আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন— ‘হামে নিহত ৪৫১ জনের সংখ্যায় দেখতে চাই না বুকের ধনকে। এটাই আমার শেষ ভরসা।’
গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন রুবেল। শিশু ফরহাদের নিথর দেহ যেন দেখতে না হয়, সেজন্য সব ব্যস্ততা। স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন টিকিট কাটতে। চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাওয়ার অপেক্ষা যতই বাড়ছে, ততই ভর করছে সন্তান নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা— আগামীর সময়কে জানালেন দিশাহারা অভিভাবক।
রুবেল বললেন, ‘ও-ই আমার শেষ ভরসা। সে যদি না বাঁচে, তাহলে আমি বাঁচব কী করে? আল্লাহ তুমি রহম করো। হামে নিহতদের কাতারে যেন আমার মানিককে দেখতে না হয়।’
মাদারীপুর থেকে পাঁচ মাস বয়সী সন্তান নিয়ে রাজধানীতে এসেছেন শাহিনূর বেগম। একই হাসপাতালের তৃতীয় তলার দেয়ালের পাশে মেঝেতে শুয়ে বুকে আগলে রেখেছেন সন্তান রাইদাকে। ক্লান্ত চোখে তিনি জানালেন, কয়েকদিন ধরে তার সন্তান কিছুই খাচ্ছিল না, কমেনি জ্বরও। অবস্থার অবনতি দেখে দ্রুত হাসপাতালে আনেন। চিকিৎসক দেখানোর পর হন কিছুটা আশ্বস্ত।
এদিকে, শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিন দেখা যায়, শিশু রোগীতে ঠাসা ছিল জরুরি বিভাগ। এই বিভাগের টিকিট কাউন্টারের পেছনেই শিশুদের ওয়ার্ড, যেখানে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা একাধিক রোগী। সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠতেই দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডের ভেতর ও বাইরে মেঝেতে শুয়ে আছে বহু রোগী ও স্বজন। কোথাও কোথাও শিশুকে বুকে জড়িয়ে নিঃশব্দে বসে আছেন ক্লান্ত অভিভাবকরা।
ও-ই আমার শেষ ভরসা। সে যদি না বাঁচে, তাহলে আমি বাঁচব কী করে? আল্লাহ তুমি রহম করো। হামে নিহতদের কাতারে যেন আমার মানিককে দেখতে না হয়
রূপগঞ্জ থেকে আসার তথ্য দিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব হোসনারা বেগম। তিন দিন আগে হাসপাতালে আসেন। তখন নাতির অবস্থা ভালো ছিল না। চিকিৎসায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে ছাড়পত্রও দেওয়ার কথা— স্বস্তি প্রকাশ করলেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসে হামে ৪৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪টি সরাসরি হামে এবং ৩৭৭ জনের উপসর্গ ছিল। একই সময়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয় ৫৫ হাজার ৬১১ জন। রোগটি শনাক্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৪১৬।
অন্যদিকে, গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫৫৫, শনাক্ত ৯৮। আর মৃত্যু হয়েছে দুজনের। চট্টগ্রামে সন্দেহজনক রোগী ২২৭, শনাক্ত দুজনের। মৃত্যুর সংখ্যা এক। এ ছাড়া বরিশাল, খুলনা, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, সব বিভাগে একজন করে আক্রান্তের তথ্যও মিলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে ফিভার কর্নার চালু, হামপ্রবণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসা নির্দেশিকা সব পর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
সময়মতো টিকা না পেলে কোমলমতিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ে উল্লেখ করে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জিয়াউল হক বললেন, সফল টিকাদান কর্মসূচিতে দেশে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল হাম। কিন্তু গত দুই বছরে এ কর্মসূচিতে ছেদ পড়ায় চলতি বছরের মার্চ থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
হামে আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসায় দেরি হলে বাড়ে জটিলতা। হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়, ফলে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো রোগ সহজেই আক্রমণ করে— পরামর্শ মা ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লার।
তিনি জানালেন, আক্রান্ত শিশুদের ১ শতাংশের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করলে সুস্থ হয় অধিকাংশ রোগী।