Image description

মশিউর রহমান একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। বাসা থেকে কিছুটা দেরিতে বের হন। অফিসে মিটিং থাকায় ড্রাইভার কামালকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে বলেন। ড্রাইভার বলেন, ‘স্যার আমি জোরে গাড়ি চালাতে পারব না। রাস্তায় গতির যে সীমারেখা দেওয়া আছে সে অনুযায়ী গাড়ি চালাতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা যাবে। এ ছাড়া গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা তো হবেই।’ নগরীর একজন বাইকচালক বলেন, ‘ফুটপাত দিয়ে বাইক উঠিয়ে দিয়েছি, পরদিন দেখি মোবাইল ফোনে মামলার এসএমএস এসেছে, ২ হাজার টাকা। এখন গাড়ি চালানোর আগে দেখি, কোন মোড়ে মোড়ে বাতি আছে। আগে দেখি, লাল বাতি না নীল বাতি। তারপর গাড়িটা চালাই।’ এভাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ক্যামেরায় ধরা পড়ছে রাঘববোয়াল-প্রভাবশালীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের যানবাহন। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা হচ্ছে। গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএস দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে জরিমানার টাকার অঙ্ক। এতে করে সড়কে আইন ভাঙার প্রতিযোগিতায় অনেকটাই ছেদ পড়েছে। মামলার আতঙ্কে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি দেখলেই নিয়ম মেনে চলছে চালকরা।

এতে ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার শহরে শৃঙ্খলা ফেরার নতুন আশা তৈরি হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা ধনী-গরিব চেনে না। সে চেনে যানবাহন। ৭ মে থেকে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা সক্রিয় করা হয়েছে। ঢাকা শহরের রাস্তায় এআই প্রযুক্তি সক্রিয় করার পর প্রতিদিন হাজার হাজার মামলা আসছে। সেটি যাচাইবাছাই করে বিভিন্ন আইন অমান্যের কারণে এ পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি মামলা করা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এআই ক্যামেরা ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবহনের ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ধারণ করছে। এরপর বিআরটিএর ডেটাবেস থেকে তথ্য নিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন অমান্যকারী যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করে এবং ডিজিটাল মামলা জেনারেট করছে। সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিং বা স্টপ লাইন অতিক্রম করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি, অবৈধ পার্কিং এবং বাম পাশের লেন ব্লক করে রাখা, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, ফুটপাত দিয়ে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধগুলো এআই ক্যামেরায় ধরা পড়ছে। মামলার ভিডিও প্রমাণসহ (ফুটেজ) ডিজিটাল মামলাটি সরাসরি গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএস বা ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে।

 নোটিস পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা, সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। ঢাকা মহানগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং ট্রাফিক পুলিশের ম্যানুয়াল কাজের চাপ কমাতে এই উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। প্রাথমিকভাবে আটটি পয়েন্টে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সেগুলো হলো রায়সাহেব বাজার, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, সোনারগাঁও, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট ও গুলশান। এক বছরের মধ্যে ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের। এআই ক্যামেরা নগরীর যানবাহন চালকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এরই মধ্যে সফলতাও আসছে। বেশির ভাগ চালকই আইন মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন। যানবাহনচালকরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরার বিষয়ে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি রয়েছে। অনেকে এ বিষয়টি জানেন না। তবে ট্রাফিক পুলিশ বলছে, ৬০ শতাংশ গাড়ির চালকরা ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন। ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও নজরদারিতে এআই ক্যামেরার পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ বডি অন ক্যামেরা ব্যবহার করছে। এর আগে যানবাহনে বিআরটিএর দেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবহার না করলে জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ১১ মে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এ বিষয়ে এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

এতে বলা হয়, সরকারনির্ধারিত রং, ডিজাইন ও সাইজ অনুযায়ী নম্বর প্লেট নির্ধারিত স্থানে ব্যবহার করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক যানবাহনে বিআরটিএ সরবরাহকৃত রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে না। আবার কিছু যানবাহনে নম্বর প্লেটের পরিবর্তে পেইন্ট দিয়ে লেখা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক যানবাহনের মালিক নম্বর প্লেটের অর্থ পরিশোধ করলেও বিআরটিএ থেকে নির্ধারিত নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সংগ্রহ করেননি। এ ছাড়া অনেক যানবাহনের উইন্ডশিল্ডে স্থাপিত আরএফআইডি ট্যাগ অকার্যকর অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, ডিএমপির আওতাধীন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে এআই ক্যামেরা সক্রিয় করা হয়েছে। হাজার হাজার আইন অমান্য করার ঘটনা ঘটছে। সেগুলো আমরা যাচাইবাছাই করে এ পর্যন্ত ৩০০-এর অধিক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। যানজট নিরসন এবং যানবাহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুরো ঢাকা মহানগরীতে এআই ক্যামেরা সক্রিয় করা হচ্ছে। শহরের সড়কে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা চালু করার পর যানবাহনচালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বেড়েছে।