Image description

সরকার আসে, সরকার যায়। পরিবর্তন হয় না নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থার। বিশেষ করে কোনোভাবেই বন্ধ করা যায় না লক্কড়ঝক্কড় বাসের দৌরাত্ম্য। সব সরকারের সময়েই গণপরিবহন ঘিরে তৈরি হয় নতুন নতুন সিন্ডিকেট। প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের কারণে নগরীকে বিপজ্জনক পরিবহনমুক্ত করা যায় না। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ, বিআরটিএ মিলেমিশে দশকের পর দশক রাজধানীকে নষ্ট করছে। শুধু নগরের সড়কে নয়, মহাসড়কেও একই অবস্থা। অথচ একটি দেশ কতটা সভ্য তা বোঝা যায় সেদেশের বিমানবন্দর, গণপরিবহন এবং গণশৌচাগার দেখে। সভ্যতার এই মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থা লজ্জাজনক পর্যায়ে। সুতরাং মানসম্মত, বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম নগর থেকে লক্কড়ঝক্কড় গণপরিবহন অপসারণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।  

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। লোক দেখানোর কোনো কাজ করলে চলবে না, মাঝপথে থেমেও যাওয়া যাবে না। ঢাকাসহ সারা দেশে ক্যানসারের মতো ছোট ছোট গাড়ি বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোভ্যানে ছেয়ে গেছে। এগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গণপরিবহন হিসেবে বাসকে জনপ্রিয় করতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক থেকে লক্কড়ঝক্কড় বাস প্রত্যাহার করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা সোসাইটি, গুলশান-বনানী সোসাইটি পরিবহনে শৃঙ্খলা দেখিয়েছে। এসব সোসাইটি সফলতা দেখালে সরকার কেন পারবে না ঢাকা শহরকে সুন্দর করতে। মূলত ইচ্ছাশক্তি থাকা দরকার।’ সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙা দরজা-জানালা, রং উঠে যাওয়া, ঘষামাজায় বিবর্ণ বাসের চারপাশ আর ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের এসব গণপরিবহন একদিকে যেমন নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট করছে, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে যাত্রীদের। মাঝে মধ্যেই নানা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে আলোচনায় আসা এই গণপরিবহনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আসলে কার সে প্রশ্নই এখন উঠছে জোরেশোরে।

মূলত সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার সড়কে যানবাহন চলাচলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। একটি হলো বিআরটিএ আর অন্যটি হলো পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এর মধ্যে বিআরটিএ ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে থাকে। একটি বাসের ৩২টি বিষয় পর্যবেক্ষণের পর তাদের ফিটনেস সনদ দেওয়ার কথা থাকলেও ভাঙাচোরা বাসগুলো কীভাবে এই সার্টিফিকেট পায়, তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে বহু বছর ধরেই। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিআরটিএ তে না নিয়েই গাড়ির ফিটনেস দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেট পাস বা জিপি কিংবা সমিতির সদস্য ফিসহ নানা অজুহাতে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট পরিবহন নেতারা সাধারণ বাস-ট্রাকমালিকদের কাছ থেকে দৈনিক, মাসিক ও এককালীন নানা অঙ্কের টাকা চাঁদা নিয়ে থাকে। 

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি ছিল পুরো পরিবহন খাত। ’২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবহন খাতের সিন্ডিকেটেও ঘটেছে পরিবর্তন। আওয়ামী সিন্ডিকেট পালালে এখন সেই জায়গায় আসীন হয়েছেন আওয়ামীবিরোধী পরিবহন ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তারাও সেই আগের কায়দায় নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি ও একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তারা আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের পরিবহন কোম্পানি বা বাসগুলো নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে ভিন্ন নামে পরিচালনা শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই আগের মতোই চলছে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, মাদকাসক্ত চালক-হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো। কোনোভাবেই দখলদারি, চাঁদাবাজি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের লাগাম টানা যাচ্ছে না এই খাতে। 

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ২ মার্চ রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবারও দ্বিতীয় বৈঠক করেন সরকারপ্রধান। সেখানে অংশ নেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. সামছুল হকের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল। সেখানে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের চিত্র পাওয়া যায় সে দেশের অবকাঠামো এবং পরিবহন ব্যবস্থা দেখলে। কোনো বিদেশি এসে বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থাগুলো দেখলে বিস্ময় প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের বাজে ধারণা তৈরি হয়। বিশেষ করে রাজধানী কেন্দ্রিক গণপরিবহন খুবই নাজুক। অধিকাংশ বাসের বডি জং ধরা, অনেক ক্ষেত্রে টিন দিয়ে তালি লাগানো। বাসের ভিতরে আসনগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়; বসার অযোগ্য ছিঁড়ে যাওয়া সিট আর নড়বড়ে মেঝের ওপর দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করছেন হাজারো মানুষ। অনেক বাসের হেডলাইট নেই, আবার কোনোটির ইন্ডিকেটর কাজ করে না। বৃষ্টির দিনে বাসের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া যেন এক সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এসব লক্কড়ঝক্কড় বাসের ইঞ্জিনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, তা থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়া নগরীর বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি বিকট শব্দে হর্ন বাজানো এবং ইঞ্জিনের ঘড়ঘড় শব্দে শব্দদূষণ চরমে পৌঁছেছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব বাস মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ায় যানজট আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। সড়ক দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এসব ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে। ব্রেক ফেইল করা বা চলন্ত অবস্থায় চাকা খুলে যাওয়ার মতো ঘটনা এসব বাসের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন বাসগুলো আমরা জব্দ করছি। নিয়মিত ড্যাম্পিং করা হয়। এই বাস যেন রাস্তায় আর না চলে সেজন্য সচেতনতা তৈরি করতেও কাজ করছি। কিছুদিন আগে আমরা একটা গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ যাত্রাবাড়ী থেকে টঙ্গিগামী আলমাছ নামের এক নিয়মিত যাত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে এসব বাসে চড়তে হয়। সিট থেকে শুরু করে বাসের জানালা সবই ভাঙা। ভাড়ার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই, কিন্তু সেবার মান অত্যন্ত নিম্ন। আমরা কি নিরাপদ ও আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা পাওয়ার যোগ্য নই?’ ঢাকা যখন স্মার্ট সিটির স্বপ্নে বিভোর, তখন সড়কে এমন লক্কড়ঝক্কড় বাসের উপস্থিতি এক বড় বৈপরীত্য। নগরবাসীর যাতায়াত নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে হলে এই ‘মুড়ির টিন’ মার্কা বাসগুলো উচ্ছেদ করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।