Image description

আমেরিকার আকাশে এখন কেবল তারার মেলা নয় বরং আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক সব ক্ষেপণাস্ত্র। বিশ্বজুড়ে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পেন্টাগন এখন এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুরোনো প্রযুক্তির বিদায় আর হাইপারসনিক গতির জয়জয়কার পরিলক্ষিত হচ্ছে। শীতল যুদ্ধের সেই পুরনো রেষারেষি কাটিয়ে উঠে যুক্তরাষ্ট্র এখন আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে ঢেলে সাজাচ্ছে। বিশেষ করে মহাকাশ গবেষণা ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে একসময়ের সেই তীব্র প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র রকেট প্রযুক্তিতে শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে এগোলেও জার্মান বিজ্ঞানীদের মেধা আর বিপুল বিনিয়োগের জোরে দ্রুতই তারা সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেই ১৯৪০-এর দশকে ভি-টু মিসাইলের অনুকরণে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ সেন্টিনেল কিংবা ডার্ক ঈগলের মতো বিধ্বংসী প্রযুক্তিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সলিড ফুয়েল (কঠিন জ্বালানি) উদ্ভাবন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি এগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও লক্ষ্যভেদী করে তোলা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সময়ে এসে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের রূপরেখা নির্ধারণ করছে।

মার্কিন পরমাণু সক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো তাদের ট্রায়াড সিস্টেম, যা মূলত ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র; এই তিন ক্ষেত্র থেকে আঘাত হানতে সক্ষম। বর্তমানে আমেরিকার হাতে থাকা ৪ শতাধিক মিনিটম্যান থ্রি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কয়েক দশক ধরে নিরপান্তা নিশ্চিত করলেও ২০৩০ সালের মধ্যে সেগুলোর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এলজিএম-৩৫এ সেন্টিনেল ক্ষেপণাস্ত্র। যদিও এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটির নকশা কিছুটা আগের মতোই রাখা হয়েছে, তবে এর ভেতরে থাকা নতুন প্রজন্মের জ্বালানি ও উন্নত গাইডেন্স সিস্টেম একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পেন্টাগন এখন সাশ্রয়ী কিন্তু কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সমুদ্রের তলদেশে মার্কিন পারমাণবিক ঢাল হিসেবে ট্রাইডেন্ট টু মিসাইল এখনো অপরাজিত এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওহাইও এবং নতুন কলম্বিয়া-ক্লাস সাবমেরিনগুলোতে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি শত্রুপক্ষের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ। এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। যদিও হাইপারসনিক ওয়ারহেড ব্যবহারের বিষয়টি এখনো অনেক ক্ষেত্রে গোপন রাখা হয়েছে, তবুও ধারণা করা হয় যে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের গোপন প্রজেক্টের মাধ্যমে পানির নিচ থেকেও শব্দের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত গতির আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে।

আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখতে বি-৫২ এবং বি-২১ রেইডারের মতো বোমারু বিমানগুলোতে নতুন লং রেঞ্জ স্ট্যান্ড-অফ মিসাইল যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কেবল পরমাণু অস্ত্র বহনেই সক্ষম নয়, বরং রাডার ফাঁকি দেওয়ার অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিতে সজ্জিত। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হাইপারসনিক এয়ার-লঞ্চড মিসাইলগুলো যখন পুরোপুরি মোতায়েন হবে, তখন মার্কিন বিমান বাহিনীর হামলা করার ক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আধুনিক যুদ্ধের কৌশল হিসেবে আকাশ থেকে ছোড়া এসব ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যুহ চূর্ণ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রচলিত সমরাস্ত্র ভাণ্ডারকে ব্যাপকভাবে আধুনিকায়ন করেছে। টমাহক ক্রুজ মিসাইলের মতো কিংবদন্তি অস্ত্রগুলো এখন আরও উন্নত সংস্করণ হিসেবে জাহাজ ও সাবমেরিনে মোতায়েন করা হচ্ছে। বিশেষ করে জেএএসএসএম-এর মতো স্টিলথ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম উপগ্রহের সহায়তা নেওয়ার ক্ষমতা এদেরকে যেকোনো আবহাওয়ায় বা পরিস্থিতিতে নিখুঁত নিশানায় পৌঁছে দেয়।

২০২৬ সাল থেকে পেন্টাগন তাদের স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় ডার্ক ঈগলের মতো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল মোতায়েন শুরু করতে যাচ্ছে। এটি শব্দের চেয়ে ১৭ থেকে ২০ গুণ বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হতে পারে, যা বর্তমানে যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। যদিও এই প্রকল্পের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, তবুও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিশাল ব্যয়কে যৌক্তিক মনে করছে মার্কিন প্রশাসন। এই ধরনের সমরাস্ত্র বিশেষ করে ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমেরিকার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

পেন্টাগনের ২০২৬ সালের রেকর্ড পরিমাণ সামরিক বাজেট মূলত এই নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যাপক উৎপাদন ও পরীক্ষার জন্যই বরাদ্দ করা হয়েছে। ট্রাম্প-ক্লাস যুদ্ধজাহাজ থেকে শুরু করে টাইফুন মিসাইল সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্মগুলো আগামীর সংঘাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। যদিও এই বিশাল বিনিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল বা কার্যকারিতা বুঝতে দশকের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, তবে এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কেবল আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং হাইপারসনিক গতি ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে তাদের রণকৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব নতুন করে প্রমাণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।