Image description

রাজধানীর বাজারে সবধরনের সবজির দাম বেড়েই চলেছে। দাম কমার কোনো লক্ষণই নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই দাম আরও বাড়ে। কয়েকটি বাদে প্রায় বেশির ভাগ সবজি এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার উপরে। দফায় দফায় মাছ, মাংস ও ডিমের দাম বাড়ার পর এবার চড়া হতে শুরু করেছে মসলার বাজার। এ পরিস্থিতিতে পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে নতুন করে চাল, ভোজ্য তেল ও মসলার দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তদারকি জোরদার না হলে ঈদের আগে বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংসারের খরচ।
শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের দামের এই চিত্র দেখা গেছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত এক মাসের মধ্যে বাজারে আটা, ময়দা, সয়াবিন ও পাম তেল, মসুর ডাল, পিয়াজ, মুরগি, ডিম, বিভিন্ন ধরনের মাছ, মাংস ও মসলার দাম বেড়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো পণ্যের দাম গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বেশি। যেমন বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯.০৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারে বিভিন্ন নিত্যসামগ্রীর দাম বেড়েছে। সেইসঙ্গে সীমিত কিংবা নিম্নআয়ের মানুষের কষ্টও বেড়েছে।
আকাশছোঁয়া সবজির দাম: সবজির বাজারে অধিকাংশ সবজির কেজি এখন ৮০ থেকে ১২০ টাকার ঘরে দেখা গেছে। কাঁকরোল ও গোল বেগুন প্রতি কেজি ১২০ টাকা, লম্বা বেগুন ও দেশি শসা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পটল ও করলা ৮০ টাকা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ১০০ টাকা এবং ঢেঁড়স ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, জালি প্রতি পিস ৬০ টাকা, লাউ ৭০ টাকা এবং পেঁপে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজি দরে।

কাওরান বাজারের সবজি বিক্রেতা তারেক বলেন, বৃষ্টির কারণে কৃষকের অনেক সবজি নষ্ট হয়েছে, পরিবহন খরচও বেশি। আবার অনেক সবজির সিজন শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। রাজধানীর মগবাজার এলাকার আরেক সবজি বিক্রেতা জাহিদুর বলেন, সবজির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আমাদের ব্যবসা অনেকটা কমে গেছে। আগে যেখানে একজন ক্রেতা ১ কেজি সবজি কিনতেন, সেখানে এখন আধা কেজি, আড়াইশ’ গ্রাম করে সবজি কিনছেন। বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মতিন সবজির দামের বিষয়ে বলেন, বাজারে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই, দুই-এক রকমের সবজি তাও ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সবজির দাম এত বেশি হলে, আমাদের মতো মানুষ কী খাবে? আগে ১ কেজি করে সবজি কিনলেও, এখন কিনতেছি আধা কেজি বা আড়াইশ’ গ্রাম। সবজির বাজারে কোনো মনিটরিং কখনো দেখলাম না। যদি মনিটরিং হতো তাহলে অন্তত যে যার মতো করে এতটা দাম বাড়িয়ে রাখতে পারতো না।

মাংস ও ডিমের দাম: বাজারে প্রতি কেজি পাকিস্তানি কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ টাকা এবং গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি দরে। ডিমের বাজারও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাদা ডিমের ডজন ১৩০ টাকা, বাদামি রঙের মিক্স ডিম ১৪০ টাকা এবং বড় আকারের বাদামি ডিম ১৫০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে আরও বেশি। বাজার করতে আসা আতাউর আক্ষেপ করে বলেন, ডিমের দাম দেখে অবাক হচ্ছি। এক হালি ডিমের দাম এখন ৫০ টাকা। এই একটা জিনিস কিছুটা সস্তা ছিল, তাও এখন নাগালের বাইরে। আর ২০০ টাকার নিচে তো বাজারে কোনো মাছই পাওয়া যাচ্ছে না।

মাছের দাম: মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ২০০ টাকার নিচে কোনো মাছ নেই। প্রতি কেজি কাতল মাছ ৩৬০ টাকা, রুই ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ টাকা, সিলভার কার্প ১৮০ টাকা, কৈ ২২০ টাকা, পাঙাশ ২০০ টাকা এবং পাবদা মাছ ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, সবধরনের মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে বেড়েছে দাম। প্রকারভেদে প্রতি কেজি মাছের দাম ৩০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
চাল ও তেলের সংকট: বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হলেও চালের বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই। খুচরা পর্যায়ে মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টিসিবি’র বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ৪ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম সাড়ে ৯ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, লাভ কম হওয়ায় অনেক দোকানদার তেল রাখা কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে পাড়া-মহল্লার দোকানে সরবরাহ কমেছে।

মসলার বাজারে অস্থিরতা; আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে মসলার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এলাচের দাম ৩০০ টাকা বেড়ে ৪৬০০ টাকায় ঠেকেছে। লবঙ্গ ১৪৫০ টাকা, আলুবোখারা ১৫০০ টাকা (আগে ছিল ৯০০ টাকা) এবং কিশমিশ ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া জিরা ৬৫০ টাকা, দারুচিনি ৫০০-৬০০, ধনিয়ার গুঁড়া ২০০ থেকে ২৮০ টাকা এবং তেজপাতা ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঈদের আগে বাদামের বাজারেও উত্তাপ ছড়িয়েছে।

পেস্তা বাদাম কেজিপ্রতি ৪২০০ টাকা এবং কাজুবাদাম ১৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে পিয়াজের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে অন্তত ১০ টাকা। এর সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে আদা। এ পণ্যটির দামও কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের মতে, পিয়াজের দাম কিছুটা বাড়লেও পণ্যটি এখনো সবার নাগালের মধ্যে আছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, রমজানের ঈদে দাম বাড়াতে ব্যর্থ হয়ে অসাধু সিন্ডিকেট এখন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা করছে। বাজার করতে আসা ক্রেতা শরিফুল বলেন, ঈদের ১০-১২দিন বাকি থাকতেই সব মসলার দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে বিক্রেতারা এর দায় চাপাচ্ছেন পাইকারি বাজার ও আমদানির খরচ বৃদ্ধির ওপর।