Image description

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন তারেক রহমান। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন—অভিযোগ পেলে যে যত বড় পদেই থাকুন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দলীয় এমপি-মন্ত্রীদের বেলায়ও এ পদক্ষেপ আরও জোরালো হবে। তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে চায় সরকার। সর্বশেষ গত ১০ মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে দলের এক কর্মসূচিতে সেই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ নিয়ে সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হচ্ছে। আসলে কোন প্রক্রিয়ায় মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, তা নিয়ে একেকজন একেকভাবে বিশ্লেষণ করছেন।

জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে নির্বাচিত লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অনেক বিষয়েই আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই আমাদের যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বক্তব্য রাখেন। আবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও মন্ত্রী-এমপিদের ত্রুটি-বিচ্যুতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সব কাজ তদারকি করছেন। তিনি কাউকেই জবাবদিহির বাইরে রাখতে চান না। এ জন্য ইতোমধ্যে আমরাও যেকোনও কাজের আগে সতর্কতা অবলম্বন করছি।’’

প্রধানমন্ত্রী যা বলেছিলেন

জাতীয় সংসদের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের কাছেও এমপি-মন্ত্রীদের জবাবদিহির বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১০ মে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে বিএনপি ও তিনটি সহযোগী সংগঠনের যৌথ মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘কাউকেই অন্যায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। সরকারের পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে মন্ত্রী-এমপিদের।’’

তিনি জানান, প্রতি তিন মাস অন্তর এধরনের সভার মধ্য দিয়ে মন্ত্রীদের কার্যক্রম, অনিয়ম যেমন সামনে আনা হবে, তেমনই সরকারের নেওয়া উদ্যোগকেও দল ও নেতাকর্মীর সামনে তুলে ধরা হবে।

অতীতের পুনরাবৃত্তি নাকি যথাযথ বাস্তবায়ন?

সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে বারবার মন্ত্রী-এমপিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তবে এর প্রক্রিয়া বা সদিচ্ছা নিয়েও হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনেকে বলেছেন, অতীতে এ ধরনের প্রতিশ্রুতির অভিজ্ঞতা তেমন ভালো নয়। তারপরও সরকারকে আরও সময় দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অতীতের সব সরকারই শুরুতে দুর্নীতিসহ যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মন্ত্রী-এমপিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তেমন দেখা যায়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। চাইলে প্রতি একবছর পরপর মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের বিবরণী চাইতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমার দৃষ্টিতে সরকার-প্রধান অনেক কথাই রাখতে পারছেন না। সার্বিক বিষয়ে লক্ষণ ভালো মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে সরকার কোনও কিছু খোলাসা করছে না। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও এখন মনে হচ্ছে সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র। এর বাইরেও কিছু মন্ত্রী-এমপির বিষয়ে নানা বিতর্ক দেখা গেছে। তবে সরকার যেহেতু ৬ মাস সময় চেয়েছে, তাই আমরা তাদের আরও সময় দিতে চাই।’’

একই কথা বললেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘পুরোনো জামানাতেও সরকার-প্রধানরা নিজেদের দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির বিষয়ে অনেক কথা বলতেন। কিন্তু পরবর্তী অভিজ্ঞতা তেমন ভালো ছিল না। তারেক রহমান দলের মন্ত্রী-এমপিসহ নেতাদের বিষয়ে যা বলেছেন, তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। অন্যথায়, জনগণ আগের সরকারগুলোর সঙ্গে বর্তমান সরকারের পার্থক্য খুঁজতে শুরু করবে। কথায় আছে, যেকোনও ভালো কাজ নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হয়।’’

কোন প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে সরকার?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার মন্ত্রী-এমপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করছেন সরকারপ্রধান। এক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীর-এমপির ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর হাতে জমা হয়েছে। দলের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু দুর্নীতিই নয় বরং যেকোনও পেশিশক্তি বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও কঠোর। তাদের বিশ্বাস—প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপে দেশে সুশাসন এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। তিনি নিয়মিত মন্ত্রী-এমপিদের কার্যক্রমের খোঁজ-খবর রাখছেন। সরকার সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। তাই কোনও অনিয়ম ও অন্যায়কারীকেই প্রধানমন্ত্রী ছাড় দেবেন না।’’