শিশুটির বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। ফুটফুটে সুন্দরী জেরিন। মায়াবী এই শিশুকন্যার কথা মনে করেই বাবা হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন। কাজকর্মেও মন বসছে না তার। ঠিকভাবেও কষ্টের কথাগুলো গুছিয়ে বলতেও পারছেন না শিশুটির বাবা মো. সবুজ মিয়া। রাজধানীতে গ্যাসের চুলার কাজ করেন (মিস্ত্রি) তিনি। প্রতিদিনের রোজগার দিয়েই কোনোরকম তাদের চারজনের ছোট্ট সংসার চলে যেত। মেয়ের মৃত্যু প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, ওর কথা মনে পড়লেই রাতে ঘুম হয় না। গত ২৭শে মার্চ সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর মহাখালীস্থ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের উপসর্গে মারা যায় তার সদা হাসোজ্জ্বল কন্যাশিশুটি। ধারাবাহিকভাবে ১৫ মাসের মাথায় হামের টিকা পাওয়ার কথা থাকলেও তার মেয়ে ওই টিকাটি পায়নি বলে নিশ্চিত করেন সবুজ।
একপর্যায়ে পাশে থাকা তার স্ত্রী ময়নাও কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তুলে ধরেন মেয়ে হারানোর বেদনা ও তাদের বর্তমান কষ্টের কথা। তিনি জানান, তার মেয়েকে রাজধানীর চারটি সরকারি নামকরা হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচাতে পারেননি তারা। অভিযোগ করেন সঠিক চিকিৎসার অভাবে তার মেয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেছে। হাসপাতালগুলোর সেবা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। সরকারি হাসপাতালে কেন ভালো চিকিৎসা থাকবে না। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে হয়তো তার মেয়ে বেঁচে যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন- বারবার বলার পরও আমার মেয়েকে স্যালাইন দেয়নি হাসপাতাল থেকে। মা ময়না তার মেয়ের অসুখের বর্ণনা দিয়ে বলেন, রোজার মাঝামাঝি সময় শিশুটি অসুস্থ হলে প্রথমে নিয়ে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।
সেখানকার চিকিৎসকরা শিশুটিকে টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা দিয়েছে বলে জানান জেরিনের মা। কুর্মিটোলা হাসপাতালে ৬/৭ দিন থাকার পর একটু সুস্থ হলে মেয়েকে নিয়ে মহাখালীস্থ ওয়ারলেস গেট বাসায় ফিরে আসেন তারা। বাসায় আসার ৭/৮ দিন পর শিশুটি আবার প্রচণ্ড জ্বরে ভুগতে থাকে। ১০৩/১০৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস মাত্রায় জ্বর উঠেছিল শিশুটির। এরপর ঈদের দিন হতভম্ব হয়ে যান ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে অবস্থিত হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক দেখানোর পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। এদিকে, দিন যত যাচ্ছে তার বাচ্চা আরও দুর্বল হতে থাকে বলে জানান তিনি। শ্বাসকষ্টের জন্য দিতে হচ্ছিল নেবুলাইজারও।
মুখ লাল, চোখ বুঝে থাকে, কথাও বলছিল না শিশুটি। অবস্থা খারাপ দেখে ঈদের দু’দিন পর ছুটে যান রাজধানীর পুরান ঢাকার আরেক সরকারি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (মিডফোর্ড)। জেরিনের মা আরও জানান, এখানকার হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছিল হামের লক্ষণ আছে আপনার মেয়ের। নিউমোনিয়াও আছে। এ কথা শোনার পরপরই তারা সেখান থেকে দ্রুত চলে আসেন মহাখালীস্থ সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।
এখানে ভর্তিও হন সেদিন। এরপর শুরু চিকিৎসাও। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে একদিন সকালে তার মেয়ের অবস্থা খুব খারাপ হলে বারবার বলা সত্ত্বেও স্যালাইন দেয়নি নার্সরা। দিনভর নার্সদের কাছে হাত জোড় করে মেয়ের জন্য স্যালাইনের অনুরোধ করলেও দিয়েছে সেদিন সন্ধ্যার পর। জেরিনের মা জানান, শিশুটি মুখ দিয়ে চারদিন কিছুই খায়নি। তাই বাববার তাদের স্যালাইনের কথা বলেছিলাম।
কিন্তুকোনো লাভ হয়নি। দু’দিন সাধারণ বেডে এবং চারদিন আইসিইউতে চিকিৎসা নেয়ার পর ২৭শে মার্চ তার মেয়ে মারা যায়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, হাসপাতালে গেলে শিশু নিয়ে কেন এই অবহেলা? বারবার বলার পরও স্যালাইন দেয়নি হাসপাতাল। আমরা গরিব বলে! শিশু জেরিনকে হারিয়ে তাদের সংসার এখন চলছে কষ্টের মধ্যে। দু’মেয়ের মধ্যে ওই ছিল দ্বিতীয়। আট বছরের বড় মেয়েকে নিয়ে এখন বাকি স্বপ্ন বুনছেন তাদের এই ছোট্ট পরিবার।