Image description

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প পাস করেছে সরকার। এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে এই ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পে কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০৩৩ সালের জুন মাসে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প পাসের তথ্য জানানো হয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভা হয়। একনেক সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার ৯টি প্রকল্প অনুমোদন হয়। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের নথি অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনর্খনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততার নিরসন হবে। এতে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদনও।

মূলত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলার হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্য পুনরুদ্ধার হবে বলে আশাবাদী সরকার। দেশের প্রধান নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততার আগ্রাসন হ্রাস, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে এবং বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার। এ ছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ পানিবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূ-গর্ভস্থ পানি পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে। এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন এবং নগরায়ণেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, এটি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি শতভাগ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে এটি পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পানিসম্পদ সংরক্ষণ, কৃষিজমিতে লবণাক্ততা কমানো, বন্যা সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং সেচ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির অঙ্গীকারের সাথে সম্পর্কিত।

গতকাল সভায় সব মিলিয়ে একনেকে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার ৯টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প তিনটি ও সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি, মেয়াদ বৃদ্ধি প্রকল্প একটি।

একনেক সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলোÑ চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধন); গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধন); জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ বা পুনর্নিমাণ (প্রথম পর্যায়); হাইটেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধন); সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ বা পুনর্নিমাণ (দ্বিতীয় সংশোধন); সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ; চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) (পঞ্চম সংশোধিত) নির্মাণ; ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধন)।

সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রমুখ।