Image description
আমানতকারীদের জন্য বিশেষ স্কিম

দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুলাই থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। অবসায়নের জন্য চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ফাস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবসায়ন কার্যক্রম শুরুর আগে আমানতকারীদের জন্য একটি বিশেষ পরিশোধ স্কিম ঘোষণা করা হবে। এ স্কিমের আওতায় যেসব ব্যক্তি আমানতকারীর সঞ্চয়ের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার মধ্যে, তারা মূলধনের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন। তবে কোনো সুদ দেওয়া হবে না।

অন্যদিকে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে আনুপাতিক হারে। অর্থাৎ তহবিলের প্রাপ্যতা এবং জমার পরিমাণ বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য আলাদা একটি পরিশোধ ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমানত ফেরতের দায় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে তহবিল সহায়তা চাওয়া হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গত মঙ্গলবারের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ প্রিমিয়ার লিজিংসহ ছয়টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দেয়।

গত বছরের নভেম্বরে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর আওতায় এসব কার্যক্রম অনুমোদিত হয়। এটি ব্যর্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা অবসায়নের জন্য দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো। সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের আন্দোলনের মুখে এ সিদ্ধান্ত এলো। গত ৭ মে ছয়টি সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ১২ হাজারের বেশি আমানতকারীর জোট বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দ্রুত অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেয়। তাদের অভিযোগ, প্রায় ৭ বছর ধরে আমানতের অর্থ আটকে থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ ও মানবিক দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগের মতো গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত অনেক আমানতকারী অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়েই কয়েকজন আমানতকারীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।

 বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অনিয়ম, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকির কারণে একের পর এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধসে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমদিকে মোট ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। এগুলো হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্সসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এ ৯টি প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের জমা ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট গ্রাহকদের জমা ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুনানির পর প্রাইম ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এক বছর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।