Image description

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ফুটপাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। মাসে এ হিসাব গিয়ে দাঁড়ায় অন্তত ৬ কোটিতে। মিরপুর মডেল থানা, দারুসসালাম, কাফরুল, শাহআলী, পল্লবী ও রূপনগর থানায় অন্তত শতাধিক পয়েন্টে প্রকাশ্যেই এ চাঁদাবাজিতে অন্তত ১২৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা মাফিয়ারা এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। পুলিশের তৈরি করা একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ফুটপাত ও দোকান থেকে দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। বেশির ভাগ চাঁদাবাজই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে এ অপকর্ম করছে। অনেক চাঁদাবাজকে ‘আশ্রয়দাতা’ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নাম তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

দৈনিক চাঁদাবাজির মোট পরিমাণ : মিরপুর এলাকার বিভিন্ন প্রধান পয়েন্ট থেকে দৈনিক সব মিলিয়ে ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। মিরপুর মডেল থানা এলাকায় সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় হয়। প্রধান ৭টি পয়েন্ট থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ টাকা তোলা হয়। কাফরুল থানা এলাকার তিনটি প্রধান স্পট থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। শাহআলী থানা এলাকার তিনটি প্রধান বাজার ও মার্কেট পয়েন্ট থেকে দৈনিক প্রায় ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। ভাসানটেক থানা এলাকার দুটি প্রধান পয়েন্ট থেকে দৈনিক প্রায় ৬-৯ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয়। রূপনগর থানা এলাকার বস্তি ও ফুটপাত থেকে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার টাকা আদায় হয়। তবে এখানে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে মাসিক প্রায় ২৭ লাখ টাকা তোলা হয়, যা দৈনিক হিসাবে ধরলে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে ৪০০টি দোকান, ৫০০টি ভ্যান এবং ৪৫০টি বাস ও ২০০টি লেগুনা থেকে দৈনিক মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। গোলচত্বরসংলগ্ন ফুটপাতে ৯০০টি দোকান, ৫০০টি ভ্যান, ৪৫০টি বাস এবং লেগুনা থেকে দৈনিক মোট ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। হার্ট ফাউন্ডেশনসংলগ্ন ফুটপাতে দৈনিক প্রায় ২০ হাজার টাকা, ঝুটপট্টি এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০ হাজার টাকা, উত্তর মাজার রোড ফুটপাতে ৫০০টি দোকান থেকে দৈনিক দেড় লাখ টাকা, ফলপট্টিসংলগ্ন ফুটপাতে ২০০টি দোকান থেকে দৈনিক ৮০ হাজার টাকা তোলা হয়। এদিকে হোপের গলিটি হোপ মার্কেট হিসেবে পরিচিত। এখানে রাস্তার ওপর ভ্রাম্যমাণ দোকানদার উজ্জ্বল বলেন, আমাদের প্রতিটি দোকানে দৈনিক ৪০০ টাকা করে দিতে হয়। আর বিদ্যুৎ বিলের জন্য আলাদা ৫০ টাকা করে দিতে হয়। মাসিক হিসাবে হলে দিতে হয় ৫০০০ টাকা করে।

গাবতলী ও দারুসসালাম : দারুসসালাম থানা এলাকায় মূলত ক্যাপিটাল মার্কেট, মুক্তি প্লাজা, গাবতলী বিআইডব্লিউটিএ কয়লা ও বালুর ঘাট এবং মাজার রোড লেগুনা স্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি পরিচালিত হয়। মাজার রোড লেগুনা স্ট্যান্ড অন্যতম বড় চাঁদাবাজির পয়েন্ট। এখানে ১০০-১২০টি লেগুনা থেকে প্রতিদিন গাড়িপ্রতি ১০০ থেকে ৪০০ টাকা হারে চাঁদা তোলা হয়। মিরপুর-১ নম্বরের ক্যাপিটাল মার্কেট, মুক্তি প্লাজা (কো-অপারেটিভ মার্কেট) এবং ১ নম্বর রোডের আলী ম্যানশনসংলগ্ন এলাকা, গাবতলীসংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ-এর জমি এবং ঘাট, গাবতলী টার্মিনাল এলাকায় বড় আকারের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট রয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণে দারুসসালাম থানার রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ জড়িত।

চাঁদাবাজদের সংখ্যা : পুলিশের ওই প্রতিবেদনে প্রায় ৭০-৮০ জনেরও বেশি ব্যক্তির নাম, মোবাইল নম্বর এবং অনেকের ছবি সরাসরি সংযুক্ত করা হয়েছে, যারা মাঠপর্যায়ে চাঁদা সংগ্রহ করে। আশ্রয়দাতা ও নিয়ন্ত্রক প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন। দৈনিক দোকানপ্রতি চাঁদা ৪০০-৫০০ টাকা। এ ছাড়া ফুটপাত ও বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলা হয়। তবে মিরপুর মডেল থানা এলাকায় চাঁদাবাজির সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে অন্তত ১৬টি পয়েন্ট রয়েছে। পল্লবীতে অন্তত ১১টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বরের বিভিন্ন বাজার, স্ট্যান্ড এবং বিহারি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা রয়েছে। মিরপুর-১০ সংলগ্ন এলাকা এবং বিভিন্ন গার্মেন্টস ও দোকানপাটসহ প্রধানত ৩টি বড় পয়েন্ট রয়েছে। শাহআলীর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও সনি সিনেমা হলসংলগ্ন এলাকাসহ এখানে ৩টি মূল পয়েন্ট রয়েছে। রূপনগরে বিভিন্ন ব্লক ও বাজারসহ ৩টি পয়েন্টে চাঁদা তোলা হয়। ভাসানটেক বস্তি ও দেওয়ানপাড়া বস্তিসহ ২টি প্রধান চাঁদাবাজি পয়েন্ট রয়েছে।

কারা কারা আদায় করে চাঁদা : দেওয়ানপাড়া বাগানবাড়ি, উত্তর বাসেত বাজার ও বাগানবাড়ি ভাসানটেকের অন্যতম প্রধান চাঁদাবাজি পয়েন্ট। এখানে প্রায় ৩৫০-৪০০টি দোকান এবং ১০০-১৫০টি ভ্যান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। এখান থেকে দৈনিক আনুমানিক ৪-৬ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ভাসানটেকে চাঁদাবাজিতে আজাহার উদ্দিন সজীব, উজ্জ্বল হোসেন, রবিউল ইসলাম সুমন, দিদার হোসেন, ইসমাইল হোসেন বকুল, আবু বক্কর সিদ্দিক, রায়হান হাসান বিজয় এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইমন ও খন্দকার ইব্রাহিম খলিলের নাম পাওয়া যায়।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, রূপনগরের তিনটি প্রধান পয়েন্ট থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হয়। এ চাঁদাবাজির আশ্রয়দাতা ও মদতদাতা পল্লবী থানা যুবদলের সভাপতি নূর সালাম। চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা হলেন- শাহজালাল জনি ওরফে কালু, সাদ্দাম, সাজেদুল ইসলাম টুটুল, নিজম উদ্দিন জসিম, আবুল হোসেন আবু, শিমুল, লিটন, হারুন অর রশিদ। নূর সালামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। মিরপুর-১০ গোলচত্বরসংলগ্ন ঝুটপট্টি ও এর আশপাশের ফুটপাতে চাঁদাবাজিতে জড়িতরা হলেন- জামাল, হাসনাত, সুলতান, শাহাদাত, আবু, সিদ্দিক, মনির, রুবেল, আনোয়ার, জামিল, আমিনুল, কাইয়ুম, মহসিন, জুয়েল, শাহজাহান এবং খোকন। নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস, তাজ, ভাইগ্না সোহেল, মিরপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জুয়েল, বাবুল, জাহিদ, বিএনপি নেতা বুলবুল, জিন্নাত আলী, শহীদ, যুবদল নেতা হাসান ও গফুরের নাম পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা বুলবুল বলেন, আমার নাম শহিদুল ইসলাম, কিন্তু সবাই বুলবুল বলে ডাকে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনসংলগ্ন ফুটপাতে রাজনৈতিক অন্য ছেলেরা জড়িত, আমি না। কিন্তু সবাই আমার নাম দিছে। ফুটপাতে আমার দোকান ছিল সব উঠায় দিছে, আমি সেটাতে বাধা দিছি এজন্য আমার নাম ঢুকায় দিছে। তবে ফুটপাতে চাঁদাবাজিতে জড়িত সিটি করপোরেশনের রাজু এবং তার বাবা মজিবর। দুজনই সিটি করপোরেশনে চাকরি করে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, মিরপুর-১৩ বিআরটিএ অফিসের সামনে ও পশ্চিম পাশে চাঁদাবাজিতে শহীদ, মোস্তফা, শাহআলী মার্কেটের সামনে আশরাফুল হোসেন মামুন ও আসাদ জড়িত। পল্লবীতে দিদার, লিটন, সৈয়দ হোসেন সোহেল, বিহারি নাদিম, সোহেল, আল আমিন, নিরব, রুমান, কাজল, বাবুল, এলাহী বাবু, খোরশেদ আলম, মফিজুর রহমান মামুন ওরফে কিলার মামুন, মশিউর রহমান ওরফে মশু, আল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম ওরফে আরমান চাঁদাবাজিতে জড়িত। শাহআলীতে সোলেমান দেওয়ান, সুলতান আহমেদ, জুয়েল মুন্সি, রাজু, সুজন, মমিন, পারভীন, রুবেল, নয়ন সিকদার, বুলেট, ইউনুস, ফর্মা বাবু, আল আমিন, নুরু মিয়া, শরিফ, রুবেল, সাজ্জাদ হোসেন মিশু, আমির খসরু রবিন এবং ডুক্কু রুবেল চাঁদাবাজিতে জড়িত বলে জানা গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার বলেন, এসব ফুটপাত দখলমুক্ত না হওয়ার কারণ হলো যারা দখল করে দোকান দেয় তারা মনে করে এটি তাদের অধিকার। তবে আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি এবং নানা কার্যক্রম চলমান আছে।