দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ায় কয়লা মজুতের ক্ষমতা ২ লাখ ২২ হাজার টন হলেও এখন সেখানে রাখা আছে ৬ লাখ টন। এর বাইরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির ইয়ার্ডে আছে আরও ১ লাখ ২০ টনের বেশি। ফলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বড় পুকুরিয়া খনির জন্য ৩ মাসের কয়লা মজুত রেখে বাকি কয়লা বেসরকারি খাতে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এদিকে আগামী বছরের মধ্যে বড় পুকুরিয়া খনির সেন্ট্রাল জোনের কয়লা উত্তোলন শেষ হয়ে যেতে পারে। এই পয়েন্টের উত্তরে আরও ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। নইলে ২০২৭ সালে বড়পুকুরিয়া খনি বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য খনির উত্তরে ৬টি বোরহোল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে খনি কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ২০০৪ সালে উত্তোলন শুরুর পর এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪ হাজার ৪১৩ টন কয়লা তোলা হয়েছে খনি থেকে। এখানকার কয়লা বিক্রি করে আয় হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর খরচ হয়েছে ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। কয়লার রয়্যালটি হিসাবে সরকার পেয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪১২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
জানা গেছে, মঙ্গলবার জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য রহমান অমিত খনি পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় সংসদ-সদস্য এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে কয়লার স্তূপ দেখে তিন মন্ত্রীই হতাশা প্রকাশ করেন। সন্ধ্যায় জ্বালানিমন্ত্রী এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি হতাশাজনক। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি কয়লা ইয়ার্ডে পড়ে আছে। এখন পিডিবির বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৩ মাসের কয়লা রেখে বাকি কয়লা বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দিতে বলেছি।
২০১৮ সালের পর বড়পুকুরিয়ার কয়লা পিডিবি ছাড়া আর কাউকে বিক্রি করা হয় না। বাংলাদেশের দিনাজপুরের কয়লা তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা। এ কয়লায় সালফারের পরিমাণ দশমিক ৫৩ শতাংশ। যার দহন ক্ষমতা অনেক বেশি। পিডিবি গত বছর প্রতি টন কয়লার দাম ২০২ ডলার দিলেও এখন দিচ্ছে ১৩৬ ডলার। এ নিয়ে ক্ষোভ আছে খনি কোম্পানির স্টাফদের মধ্যে। তারা জানান, উন্নতমানের এই কয়লা পিডিবির বাইরে বেসরকারি খাতে বিক্রি করলে ২০০ ডলারের বেশি পাওয়া যাবে।
পিডিবির ভাষ্য, বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মাসে ১ লাখ টন কয়লার দরকার হয়। কিন্তু পিডিবি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ আছে ৫-৬ বছর ধরে। বাকি দুটি ইউনিটও পুরোদমে চলে না। তাই বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ১ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে জানুয়ারিতে কয়লা নিয়েছে ৩৯ হাজার টন, ফেব্রুয়ারিতে ১৯ হাজার টন, মার্চে সাড়ে ছয় হাজার টন এবং এপ্রিলে মাত্র ২১ হাজার টন। অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত পিডিবি কয়লা নিয়েছে মাত্র ৮৫ হাজার ৫০০ টন। এ কারণে খনির ইয়ার্ডে প্রতিদিন কয়লা জমছে। বড় পুকুরিয়া খনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন খনির সেন্ট্রাল জোনে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হচ্ছে। যার ৩৭০ থেকে ৫০৯ মিটার গভীরে কয়লাগুলো মজুত ছিল। এ জোনের কয়লা উত্তোলনের মতো অবস্থা আর থাকবে না। সেন্ট্রাল জোনের উত্তর এলাকায় নতুন জোনে কয়লা তোলা যাবে ২০২৮ সালে। এজন্য খনির উত্তরে ৩০১ দশমিক ৩৬ একর জমি ২০২৮ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত অধিগ্রহণ করতে হবে। তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে, কয়লা তুলতে গিয়ে বড়পুকুরিয়ার বিভিন্ন এলাকা দেবে যাচ্ছে। অনেকে ভূমিহীন হচ্ছেন। তাদের পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালে মৌপুকুর, কালুপাড়া, চেরাপাড়া, পাঁচঘরিয়া, পাতিগ্রাম, বৈদ্যনাথপুর, মথুরাপুর, শিবপুর, বাঁশপুকুর এবং কাজিপাড়া ভূমিধসের জরিপ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ সালে ১৩ কোটি টাকা খরচ করে ৩২০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে পাশের ৩০ একর জমিতে। নতুন এলাকায় খনি করলে পর্যায়ক্রমে বেশকিছু পরিবারকে পুনর্বাসন করতে হবে বলে জানা গেছে।