পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপনে শিকড়ের টানে কর্মস্থল রাজধানী ঢাকা ছাড়বেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। প্রতি বছরের মতো এবারের ঈদযাত্রায়ও বাড়িমুখী মানুষের বেশি চাপ পড়বে মহাসড়কে। তবে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য বড় আতঙ্ক ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক। সড়কে চলমান উন্নয়ন কাজ, জরাজীর্ণ সরু সেতু, ফিটনেসবিহীন পশুবাহী ট্রাকের চাপ এবং যত্রতত্র পশুর হাট বসানোর কারণে এই দুই রুটে গত কয়েক বছরের তুলনায় ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়োচিত পদক্ষেপ ও কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে এবার ঈদযাত্রা পরিণত হতে পারে এক দুঃস্বপ্নে।
মহাসড়কে তিন চাকার আধিপত্য : দেশের ২২টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু সরকারের সে নির্দেশনা আজও রয়ে গেছে কেবল কাগজে-কলমেই। বর্তমানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। গতির এ অসম লড়াইয়ে মহাসড়কগুলো এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে গাড়ির গতিও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তিন চাকার বাহনের আধিপত্য রয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনেই বীরদর্পে চলছে এসব নিষিদ্ধ যানবাহন। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের টহল দল চলে যাওয়ার পরপরই শত শত থ্রি-হুইলার প্রধান সড়কে উঠে পড়ছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক : ৪৩টি ‘ডেঞ্জার পয়েন্ট’ ও দীর্ঘ যানজটের ফাঁদ সিলেট ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের প্রধান ভরসা ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। তবে ২০৯ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথে অন্তত ৪৩টি স্থানকে যানজটপ্রবণ বা ‘ডেঞ্জার পয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি বর্তমানে চার লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। ফলে আশুগঞ্জ গোলচত্বর থেকে সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক খনন করে রাখা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির কারণে সড়কটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়েই গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ১০-১৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া নরসিংদীর মাধবদী বাসস্ট্যান্ড, পাঁচদোনা এবং ভুলতা ফ্লাইওভার-সংলগ্ন এলাকায় অবৈধ স্ট্যান্ড ও বাজার বসার কারণে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। রূপগঞ্জের ভুলতা ও কাঞ্চন ব্রিজে টোল আদায়ের পদ্ধতি আধুনিক না হওয়ায় সেখানেও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা দিতে পারে।
উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক : চন্দ্রা ও এলেঙ্গায় উৎকণ্ঠা বগুড়া তথা উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার যাত্রীদের জন্য ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কই একমাত্র ভরসা। তবে এ রুটের প্রবেশদ্বার গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ভোগান্তি এখন প্রথায় পরিণত হয়েছে। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় পোশাক কারখানা ছুটির পর লাখ লাখ শ্রমিক যখন একসঙ্গে এ মোড়ে এসে ভিড় করেন, তখন সব ধরনের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে। এর সঙ্গে যোগ হয় পশুবাহী ট্রাকের ভিড়। একই সঙ্গে সেতুর ওপর কোনো গাড়ি বিকল হলে বা টোল প্লাজায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং ধীরগতির যানবাহন (যেমন- নছিমন, করিমন, ইজিরাইডার) নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি এড়ানো অসম্ভব। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা যানজটকে আরও উসকে দেয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, সাধারণত ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র বেশি দেখি। ঈদ আসার কারণে মানুষের চাপ ও গণপরিবহনের সংকট এবং এই চাপ আসার কারণে যাত্রীরা যানজটের কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ঈদুল আজহার সময় সড়কে দুই দিক থেকে চাপ থাকে। ঢাকা থেকে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যায়। আবার বাইরে থেকে কোরবানির পশুর গাড়ি ঢাকায় আসে। আর এই চাপটা তখন সামাল দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া উন্নয়ন কাজের নামে বছরের পর বছর ভোগান্তি চলছে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণেই মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। মহাসড়কে যদি একই সঙ্গে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও স্থানীয় যান চলে তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।