Image description
বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যন্ত ঢাকার শুধু ফুটপাতে বসত হকাররা। এর বিনিময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, এলাকার সন্ত্রাসী-মাস্তানরা তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলত। কিন্তু বর্তমানে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিটি করপোরেশন ফুটপাতসহ রাস্তাও ভাড়া দিচ্ছে। সেই সঙ্গে বৈধ-অবৈধ উভয় চাঁদার হারও বেড়েছে। নিয়ম-নীতিমালা না থাকলেও বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন টাকার বিনিময়ে হকারদের কার্ড দিয়ে রাস্তাসহ ফুটপাতে বসার অনুমতি দিচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও এ কাজ করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, রাস্তায় হকার বসার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। একবার যদি হকারদের রাস্তায় বসার প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে তাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমনিতেই ঢাকার ফুটপাতে হাঁটা যায় না, সেখানে রাস্তা দখল হলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি হবে।

বিএনপি জোটের অন্যতম বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘একেক সরকার একেক ধরনের পদক্ষেপ নেয়। ফুটপাতে যেখানে চলাচল করাই দায়, সেখানে মূল রাস্তা ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বড় উদ্বেগের। সিটি করপোরেশন চাইলে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ছুটির দিনে হকার বসাতে পারে, কিন্তু সেজন্য সুপরিকল্পনা দরকার। কার্ড দেওয়ার নাম করে নানা ধরনের অনিয়ম হয়। বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া টোটকা কোনো সমাধান নেই।’  

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাস্তার মধ্যে হকার বসানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। রাস্তা গাড়ি চলাচলের জন্য। হকারদের ফুটপাতে বসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, তবে সেই ফুটপাত দিয়ে যেন মানুষ চলাচল করতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের হকারদের নিয়ে হঠকারি সিদ্ধান্তের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখন ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়কের একাংশও হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে। এতে যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ এবং জননিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে গুলিস্তান, নিউমার্কেট, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় এ পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, হকারদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কেউ ‘কার্ড ফি’, কেউ ‘লাইন খরচ’, আবার কেউ ‘নিরাপত্তা খরচ’ নামে টাকা নিচ্ছে। এতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হলেও তার কোনো স্বচ্ছতা নেই। বিগত দিনে ঢাকার ফুটপাত ছিল মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও মাস্তানদের নিয়ন্ত্রণে। তখন অবৈধভাবে সংগৃহীত চাঁদা যেত নেতাদের পকেটে। তবে বর্তমানে চিত্রটি ভিন্ন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ‘কার্ড’ দেওয়ার নামে হকারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়ে ফুটপাত ও রাস্তার একাংশে বসার অনুমতি দিচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট এবং ফার্মগেট এলাকায় ফুটপাতের সীমা ছাড়িয়ে হকাররা এখন মূল সড়কের অনেকটা অংশজুড়ে বসছে। হকারদের দাবি, তারা এখন ‘সিটি করপোরেশনের অনুমতিপ্রাপ্ত’, তাই তাদের আর উচ্ছেদের ভয় নেই। একই পথে হাঁটছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উত্তর সিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও রাস্তায় হকার বসার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। এতে সাধারণ পথচারীদের হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।

হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনকে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে কার্ড নেওয়ার পরও তাদের নিস্তার নেই। আগের মতো স্থানীয় লাইনম্যান ও মাস্তানদের একটি অংশ ঠিকই ‘দৈনিক চাঁদা’ আদায় করছে। এতে করে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি হকারদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। নিউমার্কেট এলাকার এক হকার বলেন, আগে শুধু মাস্তানদের টাকা দিতাম। এখন কার্ডের জন্য সিটি করপোরেশনকে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে, আবার মাস্তানদেরও ম্যানেজ করতে হচ্ছে। খরচ বাড়ায় আমরাও ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম নিতে বাধ্য হচ্ছি।

সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগকে ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি মেগাসিটির প্রধান রাস্তা বা ফুটপাত কখনো হকারদের ইজারা দেওয়া যেতে পারে না।

গতকাল গুলিস্তানে অফিসগামী একজন পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তা কি ব্যবসার জায়গা? সিটি করপোরেশনের কাজ রাস্তা পরিষ্কার রাখা, ভাড়া দেওয়া নয়। আমরা ট্যাক্স দিই হাঁটার জন্য, হকারদের জটলায় পড়ার জন্য নয়।