Image description
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ভাড়াবাসা থেকে তিন শিশুসহ এক পরিবারের পাঁচ সদস্যের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় তিন সন্তান, ছোট ভাইসহ গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনের দাবি, গৃহবধূর স্বামী ফোরকান মিয়া (৪০) পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করেছেন। এরপর নিজেই ফোন করে আত্মীয়দের জানিয়েছেন।

শনিবার (৯ মে) সকালে কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ি থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন– গোপালগঞ্জের বাসিন্দা ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩০), এই দম্পতির মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) ও শ্যালক গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের রসুল মিয়া (২২)।

পুলিশের ধারণা, শুক্রবার রাতের কোনো এক সময় ভাড়াটিয়া ফোরকান মিয়া স্ত্রী-সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করেছে। ঘটনার পর থেকে ফোরকান মিয়া পলাতক। লাশের পাশে কম্পিউটার কম্পোজের একাধিক চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুট, স্বজনের অভিযোগসহ একাধিক সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে পুলিশ।

শারমিন আক্তারের চাচি ইভা রহমানের অভিযোগ, ফোরকান মিয়া অনেক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের হত্যার পরিকল্পনা করছিল। এর জন্য শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়াকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে আনেন। সবাইকে হত্যার পর ফোরকান নিজেই ফোন করে আত্মীয়দের জানান। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে।

তিনি বলেন, ফোরকান তাঁর ভাই মিশকাতকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’

যৌতুকের জন্য দীর্ঘদিন ধরে শারমিনকে নির্যাতন করে আসছিলেন ফোরকান। এসব নিয়ে একাধিকবার বিচার সালিশও হয়েছে বলে জানান ইভা রহমান।

তিন স্থানে লাশ, একাধিক চিরকুট

ঘটনাস্থলে দেখা যায়, দুটি কক্ষে রক্তের দাগ। পাঁচ লাশ পড়েছিল তিন স্থানে। একটি কক্ষে খাটের ওপর কম্বলে ঢাকা ছিল রসুল মিয়ার লাশ। মেঝেতে পাশাপাশি ছিল তিন কন্যাশিশুর গলাকাটা লাশ। তাদের লাশও কম্বল দিয়ে ঢাকা ছিল। আরেক কক্ষে জানালার গ্রিলে হাত ও শরীর বাঁধা ছিল শারমিনের। তাঁর শরীরজুড়ে ছিল অসংখ্য ক্ষত।

পুলিশ জানায়, যে তিন স্থানে লাশ ছিল, প্রতিটিতেই কম্পিউটার কম্পোজের একাধিক চিরকুট পাওয়া গেছে। এসব কাগজের সূত্রে তদন্তকারীরা বলছেন, স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে থানায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছিলেন ফোরকান মিয়া। একইসঙ্গে তিনি স্ত্রীর বিরুদ্ধেও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ করেছেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, চিরকুটগুলো পড়ে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ফোরকান মিয়া জড়িত। স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা তিনি মেনে নিতে না পেরে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

একটি চিরকুটে গোপালগঞ্জ সদর থানায় লেখা অভিযোগে ফোরকান মিয়া দাবি করেছেন, গত ৩ মে তাঁকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মারধর করেছে। তবে গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের থানায় এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ কেউ দেননি।

হত্যার ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। অভিযুক্ত ফোরকান মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান।

বাসায় প্রায় হতো ঝাগড়া

প্রতিবেশীরা জানান, ফোরকান ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। তাদের ঘর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া যেত। প্রবাসী মনির হোসেনের প্রতিবেশী আলমগীর মিয়া বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি ছিল। কিন্তু এমন ভয়ংকর কিছু ঘটবে, আমরা কখনো ভাবিনি।

আরেক প্রতিবেশী হালিমা বেগম বলেন, প্রায় আমরা এই পরিবারের চিল্লাচিল্লি পেতাম। মারধরের ঘটনাও শুনেছি। কিন্তু কী কারণে ঝামেলা চলত, সেটা কাউকে বলত না।

সেমাই, মদের বোতল জব্দ

ফোরকান মিয়ার বাসা থেকে রান্না করা সেমাই, কোমলপানীয় ও একটি মদের বোতল জব্দ করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার রাতে বাসায় মাদক সেবনের ঘটনা ঘটতে পারে। এরপর একে একে সবাইকে হত্যা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, খাবারের সঙ্গে কোনো চেতনানাশক ওষুধ মেশানো হয়েছিল কিনা, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, রাতে নিহত শারমিনের বাবা সাহাদত মোল্ল্যা কাপাসিয়া থানায় মামলা করেছেন। এতে ফোরকান মিয়াকে প্রধান এবং অজ্ঞাতপরিচয়ে অন্তত পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান।