Image description
দ্য ডিসেন্ট

গত ৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ের পর রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় বিজেপি এবং তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী নীতি এবং নির্বাচনী প্রচারণায় ‘বাংলাদেশ ভীতি’ ছড়ানোর ফলে প্রতিবেশী দেশসমূহ, বিশেষ করে বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

ই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে ভারতে মসজিদগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মুসলমানদের নির্যাতন করা হচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে ভারতীয় মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয়  নেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। 

দ্য ডিসেন্ট এমন ১৫টি দাবি যাচাই করেছে। এসব ভিডিওর মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ভিডিও বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে। 

‘জামায়াত বার্তা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ৭ মে একটি ভিডিও পোস্ট করে প্রচার করা হয়, “ভারতের শুভেন্দুর নেতৃত্বে মসজিদে আ’গু’ন।” 

পোস্টটিতে ৩৭০০ মানুষের বেশি মন্তব্য করেছেন যেখানে অনেক মানুষ ভারত এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং ভারতে নির্যাতনের প্রতিবাদ না করায় বাংলাদেশে বসবাস করা হিন্দুদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

তবে, দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি আসলে কলকাতায় মসজিদে আগুন দেওয়ার নয় মূলত এটি কাশ্মীরের শ্রীনগরের হায়দারপোরা এলাকার ‘জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম’ নামক একটি মাদরাসা ও মসজিদ ভবনে লাগা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার। 

 ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল শ্রীনগরের হায়দারপোরা এলাকার জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলুম নামক একটি মাদরাসা ও মসজিদে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি এবং এতে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হয়েছে, 'কলকাতা শহরের বিভিন্ন মসজিদে বিজেপির হামলায় পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।' প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, একদল লোক একটি স্থাপনায় ভাঙচুর করছে।

যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওতে হামলার শিকার স্থাপনাটি কোনো মসজিদ নয়। এটি আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা জাহাঙ্গীর খানের অফিস ভাঙচুরের ঘটনা। ৫ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের একই ভিডিও প্রচার করে লিখেছে এটি পশ্চিমবঙ্গের ফলতা এলাকায় তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খানের অফিস ভাঙচুরের দৃশ্য। 

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতেও মসজিদে হামলার দাবিতে পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।  ৮ এবং ৯ মে দৈনিক ইনকিলাব দুইটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করে ভারতে উগ্রবাদি হিন্দুরা মসজিদে আক্রমণ করছে। তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিও দুটিই পুরোনো যা সাম্প্রতিক নির্বাচনের সাথে সম্পর্কিত না। 
শুধু মসজিদে হামলা নয়। ভারতে মুসলিমদের ঘর বাড়িতে হামলার দাবিতেও পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। নিজেদের সংবাদমাধ্যম দাবি করা ফেসবুক পেজ ‘প্রহরী নিউজ’ একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয়ী হয়েই মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভা’ঙ’চু’র করছে বি’জেপি হি’ন্দু’ত্ব’বা’দীরা। 

তবে, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সময়ের কোনো ঘটনার নয়, বরং ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বরে  আসামের গোয়ালপাড়ায় উচ্ছেদ অভিযানের ঘটনার। 

আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর আজ সকাল থেকেই তাণ্ডব শুরু করেছে বিজেপির সমর্থিত নেতাকর্মীরা।

এই ভিডিওটিও নির্বাচন সম্পর্কিত নয়। গত ৪ মার্চ ভারতের রাজস্থানের যোধপুরের প্রতাপ নগরে বেলুন ছোড়াকে কেন্দ্র করে একটি মহল্লায় যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনার দৃশ্য এটি।  ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন পাওয়া যায়। 

অগ্নিকান্ডের আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে প্রচার করা হয়েছে, বিজেপি জয়লাভ করার পর তাদের কর্মীরা রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।

 অথচ, ভিডিওটি এই নির্বাচনের আগে ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিয়ালদহ-বজবজ রেল লাইনের আক্রা স্টেশন সংলগ্ন একটি বস্তিতে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার দৃশ্য

একইভাবে নেপালে ২০২৫ সালে আন্দোলনের ভিডিও শেয়ার করে কলকাতায় মুসলিমদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে প্রচার করা হচ্ছে।

একইভাবে, ২০২৫ সালে ভারতের আসাম প্রদেশে সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা কথিত অবৈধ বসতি উচ্ছেদে পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময়ে ধারণ করা একটি ভিডিওকে নির্বাচনে জয়ের পরে বিজেপি সমর্থক কর্তৃক মুসলমানদের বাড়িঘর ও মসজিদ ভাঙচুরের দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

মুসলমানদের উপর হামলা হচ্ছে দাবিতে আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে যেটি প্রকৃতপক্ষে গত মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যমগ্রামে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ডের পুরোনো ভিডিও।

একইভাবে, গত ২৯ এপ্রিল ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুরে একটি বিয়ে বাড়িতে দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষের দৃশ্যকে মুসলমানদের উপর হামলা হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছে। 

কবরস্থানে একটি সমাধি ভাঙচুর করার ভিডিও শেয়ার করে প্রচার করা হয়েছে, এটি কলকাতায় বিজেপি সমর্থকদের মুসলমানদের কবরস্থান উচ্ছেদের ফুটেজ। অথচ, যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগের এবং কলকাতার নয়, দিল্লির ঘটনা। ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগের এবং কলকাতার নয়, দিল্লির ঘটনা। 

পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে বাংলাদেশে পালাচ্ছে মুসলিমরা বলে ছড়াচ্ছে ভিন্ন ঘটনার একাধিক ভিডিও 

ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অনুপ্রবেশকারীরা নিজেরাই বাংলা ছেড়ে বাংলাদেশে পালাতে শুরু করেছে।

যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি নির্বাচনের পরে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও নয় বরং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই ইন্টারনেটে রয়েছে। ভিডিওটি বাংলাদেশে চরমোনাই মাহফিল শেষে মুসল্লিদের লঞ্চে উঠার দৃশ্য। 

আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, বিজেপির জয়ের পর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী প্রত্যাবর্তনের জন্য সীমান্তে জড়ো হয়েছে। তবে, যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় কালী প্রতিমা প্রতিমা বিসর্জনের ঘটনার। 

আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে বহু লোক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

এই দাবিটিও সত্য নয়। ভিডিওটি মূলত চলতি বছরের ৫ জানুয়ারির পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার দাদপুরের পুইনানে বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে দেশটির মুসল্লিরা সমাবেত হওয়ার দৃশ্য।