Mohammad Nakibur Rahman (মোহাম্মদ নাকিবুর রহমান)
সময়টা ঠিক ১৯৮৮ না ১৯৮৯ ঠিক মনে নেই।
আমি তখন ১১–১২ বছরের একটা ছেলে। ঢাকায় আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাসার ঠিক উল্টোদিকেই ছিল জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অফিস।
আব্বু (মতিউর রহমান নিজামী) লন্ডনে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে যাচ্ছিলেন।
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় স্যুট পরা এক লম্বা ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন।
আব্বু হেসে বললেন,
“চলুন ব্যারিস্টার সাহেব, রেডি তো?”
লোকটা হেসে মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ।
আব্বু আবার মজা করে জিজ্ঞেস করলেন,
“ব্রিফকেস কই?”
তিনি একদম ঠাণ্ডা মাথায় বললেন,
“আমি-ই আপনার ব্রিফকেস।”
তখন বুঝিনি এই ছোট্ট কথাটাই একটা বড় গল্পের শুরু।
এরপর অনেক বছর আর কোনো যোগাযোগই ছিল না।
২০১৩ সালের গরমের সময় প্রায় ২০ বছরেরও বেশি পরে আবার দেখা। তখন আমি পিএইচডি শেষ করে একটু ফ্রি।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক আমেরিকায় এসেছিলেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের জন্য। আমি নিজেই বললাম নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে তার সঙ্গে থাকব।
প্রথম গন্তব্য ছিল জাতিসংঘ।
একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে মিটিং আমি একটু নার্ভাস ছিলাম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“নোটবুক আছে?”
না বলতেই আমরা তাড়াতাড়ি একটা দোকানে গেলাম।
তিনি বললেন,
“নোট নাও। পরে দুজন মিলে মিলিয়ে দেখব তখন পুরো ছবিটা বুঝবে।”
মিটিংয়ের বাইরে তার প্রস্তুতি ছিল একদম সিরিয়াস লেভেলের।
কার সঙ্গে দেখা করবেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, চিন্তা সব জানা।
হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন।
গাড়িতে বসে কোরআন পড়তেন আমি ড্রাইভ করছি, উনি তিলাওয়াত করছেন।
সময় নষ্ট করা এই জিনিসটা উনার লাইফে ছিলই না।
সেই এক সপ্তাহে আমার ভেতরে অনেক কিছু বদলে যায়।
তিনি ঢাকায় ফেরার সময় আমি আর শুধু ভলান্টিয়ার না আমার দায়িত্ব ছিল।
লম্বা ড্রাইভ, রাত জেগে কাজ সবকিছুতে আমি ঢুকে গেলাম পুরোপুরি।
তিনি আমাকে কাজের ভেতরে টেনে নিয়েছিলেন এমনভাবে, যে আর বের হতে পারিনি।
তারপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বর।
কাদের মোল্লা চাচার ফাঁসির কয়েকদিন পর।
হঠাৎ তার ফোন তিনি আবার ওয়াশিংটনে আসছেন।
কথায় কোনো তাড়া বা টেনশন নেই।
এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখি শুধু একটা হ্যান্ড ক্যারি।
গাড়িতে ওঠার পর খুব শান্তভাবে বললেন তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে।
ফিরতে পারবেন না কমপক্ষে এখনই না।
আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম আর চুপচাপ চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
নির্বাসনের জীবন
****************
তার মধ্যে কোনো রাগ ছিল না, কোনো অভিযোগও না।
শুধু একটা দৃঢ়তা যেখানেই থাকেন, সেখান থেকেই কাজ চালাবেন।
নির্বাসন মানুষকে ভেঙে দেয় কিন্তু তাকে পারেনি।
তিনি এটাকেও একটা রুটিন বানিয়ে ফেললেন।
প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটা বৃষ্টি হোক বা রোদ।
খাবারে কড়া নিয়ন্ত্রণ।
তিনি বলতেন,
“নিজের শরীর তুমি না দেখলে, কেউ দেখবে না।”
বই ছিল তার সবচেয়ে কাছের জিনিস।
বইয়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন।
একদিন বললেন ওবামার পছন্দের বইয়ের লিস্ট বের করতে।
মিটিংয়ে গিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন,
“এই মুহূর্তে কি বই পড়ছ?”
তার কৌতূহল সত্যি থামত না।
কিছু মজার ঘটনাও ছিল।
একদিন জিজ্ঞেস করলেন,
“Monday morning quarterback মানে কি?”
আমি আমেরিকান ফুটবল বুঝিয়ে বললাম।
আরেকদিন বললেন,
“the chips have fallen এর মানে?”
আমি একটু থেমে বললাম জুয়া থেকে আসা কথা।
তিনি হেসে দিলেন একদম নতুন কিছু শেখার আনন্দ নিয়ে।
কিন্তু তার সবচেয়ে কাছের বই ছিল কোরআন।
স্টিকি নোটে ভরা নিজের চিন্তা, প্রশ্ন।
তিনি পড়তেন, থামতেন, ভাবতেন
শেখানোর জন্য না, নিজের মতো করে বোঝার জন্য।
আর একটা জিনিস তিনি সত্যি সত্যি শুনতে পারতেন।
অনেক মিটিংয়ে অপমান, বাজে কথা সবই দেখেছি।
আমি ভিতরে ভিতরে রেগে যেতাম।
তিনি শান্তভাবে বলতেন,
“নোট নিয়েছ?”
মানে খারাপ জায়গা থেকেও শেখার কিছু থাকে।
তবে রাগ তার ছিল কিন্তু খুব কন্ট্রোলড।
একবার আমরা দেরি করছিলাম।
রাস্তা পার হচ্ছি সিগনালে “Don’t Walk”, কিন্তু গাড়ি নেই।
আমি দ্রুত যেতে চাইছিলাম।
তিনি থামিয়ে বললেন,
“আইন কখনো ভাঙবে না ছোট হলেও না।”
এই কথাটা এখনো মাথায় বাজে।
কিছু ব্যক্তিগত গল্প
******************
ধীরে ধীরে আমাদের কথাবার্তা ব্যক্তিগত দিকে যায়।
তিনি বললেন ১৯৭২ সালে তার কোনো স্যুটই ছিল না।
আমার আব্বুই তাকে একটা কিনে দিয়েছিলেন।
আবার ১৯৮৬ সালে লন্ডনের জমজমাট ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশে ফেরার সময়
এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করেছিলেন আমার আব্বুই।
তিনি এগুলো এমনভাবে বলতেন যেন কিছুই না।
লন্ডনের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন,
“টাকা সব দিক দিয়ে আসত দরজা, জানালা, এসি…”
তবু তিনি সব ছেড়ে দিলেন।
কোনো নাম বা পজিশনের জন্য না বিশ্বাসের জন্য।
আমাদের অনেক বিষয়ে মতভেদ হতো।
কিন্তু তিনি কখনো ইগো দেখাননি।
শুনতেন, যুক্তি দিতেন,
অন্যের মতকেও জায়গা দিতেন।
এটা এখন খুব কম মানুষই পারে।
কোভিডের পর তার আমেরিকা আসা কমে যায়।
শেষবার এসেছিলেন ২০২৩ সালে।
দেখা হয়নি শুধু ফোনে কথা।
বলেছিলাম, আবার দেখা হবে।
হয়নি।
২০২৫ সালের ৪ মে তিনি চলে গেলেন।
শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পেরেছিলেন।
নির্বাসনের শেষ হয়েছিল।
এটাই কিছুটা শান্তি দেয়।
তিনি এই দেশের জন্য সব দিয়েছেন
ক্যারিয়ার, আরাম, জীবনের বড় অংশ।
বিনিময়ে যা পেয়েছেন
সবাইয়ের সম্মান।
আমি তাকে খুব মিস করব
আমার মেন্টর, গাইড, আমার চাচা।
বাংলাদেশও তাকে মিস করবে।
কারণ তার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
একটা সময় শেষ হয়ে গেল।
আল্লাহ তার ভালো কাজ কবুল করুন, ভুলগুলো মাফ করুন,
আর তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ জায়গা দিন।
আমিন।
