Image description
বজ্রপাতে বছরে গড়ে ৩০০ মৃত্যু

মেঘের গর্জন শুনলেই মনে ভয় ঢোকে। আকাশ জোরে ডেকে উঠলেই অজানা এক মৃত্যুভয় কাজ করে। কারণ সম্প্রতি জাতীয় এই দুর্যোগে বহু মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বছরে বজ্রপাতে গড়ে ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়। চলতি বছর মৌসুমের শুরুতেই এই সংখ্যা ৭২-এ গিয়ে ঠেকেছে।

সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন এই সময় বজ্রপাত বেশি হয়। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কৃষক, জেলে এবং যারা খোলা মাঠে কাজ করেন তাদের বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও সেগুলো তেমন কাজে আসেনি। নতুন সরকারও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রকল্প নিতে যাচ্ছে, যা এখন প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে সাইরেন স্থাপন, আধুনিক বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা এবং হাওড় অঞ্চলে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত হাওড়ের জলীয় বাষ্প, পাহাড়ের বাধা ও ভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষে সিলেট ও তার আশপাশের এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি থাকে। জলীয় বাষ্পসমৃদ্ধ এলাকার আশপাশেই বজ্রপাত বেশি হয়। দেশে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। এর বাইরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙামাটি, পটুয়াখালী জেলায় তুলনামূলক বজ্রপাত বেশি হয়।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম-এর তথ্যে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই বজ্রপাতে ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। যাদের বেশির ভাগই কৃষক। মূলত খোলা মাঠে কাজ করার কারণেই কৃষকরা বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন। সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৩০ ব্যক্তি বজ্রপাতে মারা যান। আর ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩ হাজার ৮৩৫ জনের মৃত্যু হয়।

মূলত জমিতে কাজ করা, মাছধরা বা গবাদিপশু চরাতে গিয়ে বজ্রপাতে দুর্ঘটনা ঘটছে। কিছু ক্ষেত্রে বজ্রপাতের সময় খোলা আকাশের নিচে চলাফেরা বা খেলাধুলা করতে গিয়ে শহরাঞ্চলে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

বজ্রপাত রোধে এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও তা খুব একটা কাজে আসেনি। যদিও এজন্য ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। কাজে না আসায় ‘তাল গাছ লাগানো প্রকল্প’ মাঝপথেই থেমে যায়। এই প্রকল্পের জন্য ২০১৭ সালে দেশব্যাপী ১০ লাখ তাল গাছের চারা এরং ৩৫ লাখ আঁটি রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিচর্যা না থাকায় তাল গাছের চারা ও আঁটিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। পরে এই প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। এ ছাড়া বজ্রপাতের পূর্বাভাস জানতে ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে রাডার (লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর) বসানো হয়। কিন্তু এই প্রকল্পও ব্যর্থ হয়। আবার মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সহযোগিতায় বজ্রপাত সম্পর্কে আগাম তথ্য পেতে ‘হাই ইমপ্যাক্ট ওয়েদার অ্যাসেসমেন্ট’ নামে আরেকটি প্রযুক্তি চালু করা হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এর মাধ্যমে ৫৪ ঘণ্টা আগেই বজ্রপাত সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু কৃষক ও জেলেদের কাছে এ ধরনের প্রযুক্তি সহজলভ্য না হওয়ায় এটিও খুব একটা কাজে আসেনি। এ ছাড়া হাওড়াঞ্চলে কৃষকদের জীবণ সুরক্ষায় বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়াসহ আরও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজে আসেনি কোনোটি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা (প্রশাসন অধিশাখা) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বজ্রপাত রোধে সরকারের সাইরেন স্থাপন, আধুনিক বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার নির্মাণ এবং হাওড় অঞ্চলে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি বাস্তবায়ন কার্যক্রম এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এর বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। আমাদের পরিকল্পনা শাখার আওতায় প্রকল্প নিয়ে তা প্ল্যানিং কমিশনে পাঠানো হবে। আর কমিশন থেকে অনুমোদনের পরই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে। কোন এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় এজন্য গবেষণা প্রয়োজন। এগুলোও কমিশনে পাঠানো হবে। এরই মধ্যে এ-সম্পর্কিত নির্দেশনা দেওয়া দেওয়া হয়েছে। এরপরই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ড. দিলারা জাহিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের যে ভৌগোলিক অবস্থান তা কর্কটক্রন্তি ও মকরক্রান্তির মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছে। এর ফলে বিশ্বের যে কটি দেশ বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশও তার একটি। আবার বাংলাদেশের একদিকে হিমালয় আরেকদিকে আরব মহাসাগর। এর প্রভাবও আমাদের ওপর আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ অবস্থানগত দিক দিয়েও বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মধ্যে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন তথা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে অন্য দুর্যোগের মতো বাংলাদেশে বজ্রপাতের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। যেকোনো বড় গাছ বজ্রপাতে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমায়।’