Image description

২০০৩ সালে কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশাল পোর্ট রোড মৎস্য বন্দরের কাছে দুটি চর জেগে ওঠে। একটির নাম রসুলপুর অন্যটি মোহাম্মদপুর। চরবদনা মৌজার চর দুটির প্রায় ৫৯ একর জমি বরিশাল নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের। তবে এই জমির ছিটেফোঁটাও বরিশাল নদীবন্দরের নেই।

কারণ পুরোটাই দখল করা হয়েছে। দখলে সহায়তা করেছেন বরিশাল জেলা প্রশাসনের চার সার্ভেয়ার হাবিবুর রহমান, আবু হানিফ, মো. হানিফ ও বজলুর রহমান। এর মধ্যে মো. হানিফ মারা গেছেন, বজলুর রহমান অবসরে। তবে হাবিবুর রহমান পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় কানুনগো হিসেবে রয়েছেন, আর আবু হানিফ পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এলএ শাখায় সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন।
 
এই চারজন রসুলপুর চরে চারটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। তাঁদের সহায়তায় কীর্তনখোলা নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করতে সক্ষম হয়েছেন সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরণ ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর ভাই সবুর খান।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআইডব্লিউটিএ কীর্তনখোলা নদীর বিভিন্ন অংশের প্রায় পাঁচ হাজার দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে। এই তালিকায় এঁদের কারো নাম নেই।

সেখানে নাম রয়েছে দখলকৃত জমির ভাড়াটিয়াদের। গত কয়েক দিন আগে রসুলপুর ও মোহাম্মদপুর চরে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম পাকা ভবনটি চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের, এই ভবনের পাশেই দুটি বহুতল ভবন। একটি দোতলা, এটির মালিক সার্ভেয়ার বজলুর রহমান। তিনি বরিশাল জোনাল সেটলমেন্ট অফিসে কর্মরত ছিলেন। এই ভবনের কাছে তিনতলা ভবনের মালিক আবু হানিফ, যিনি পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন।
 
বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি জমি দখল করেন এবং ২০১৯ সালে সেখানে ভবন নির্মাণ করেন। আবু হানিফের উদ্যোগে নির্মিত ভবনের পাশেই বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার হাবিবুর রহমানের ভবন। এই ভবনে ১৮টি পরিবার ভাড়াটিয়া হিসেবে রয়েছে। হাবিবুর রহমানের ভবনের পাশেই সার্ভেয়ার মোহাম্মদ হানিফের ভবন। সেখানে ভাড়ায় থাকছে ১৫টি পরিবার। সার্ভেয়ার হানিফ মারা গেলেও তাঁর সন্তানরা ওই ভাড়া তোলেন।

পিরোজপুরে কর্মরত সার্ভেয়ার আবু হানিফ জমি ও ভবন নিজের দাবি করেন। একই সঙ্গে তাঁর অন্য তিন সহকর্মীর জমি ও ভবন থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, ওই জমি তিনি ক্রয় করে ভবন নির্মাণ করেছেন। কিন্তু এক নম্বর খতিয়ানের জমি কিভাবে ক্রয় করলেন তার জবাব না দিয়ে তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ও পরে ফোন বন্ধ রাখেন। 

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ নগরীর চাঁদমারিতেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের পেছনে নদীতীরে পাঁচ একর জমি দখল করে রেখেছেন। জমিতে তাঁর ৩০ জন পোষ্য ইট বালু সিমেন্ট ও অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনা করছেন। টিনশড ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছেন প্রায় অর্ধশত। সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ নগরীর ৩০ নম্বর গোডাউন এলাকায় খাদ্য বিভাগের নির্মাণ করা সাইলোর পাশেই নদীর দুই একর জমি দখল করেছেন। জমিটি তাঁর পরিবারের সদস্যদের দখলে রয়েছে। দেখভাল করছেন তাঁর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ। আসাদুজ্জামান খান কামাল দুই একরের বেশি জমি দখল করে রেখেছেন। সেখানে তাঁর ভাড়াটিয়া ঘর, দুটি বরফ কল ও প্রায় এক একর জমি খালি পড়ে আছে। আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে আশরাফুজ্জামান খান রনি জমি ভোগ দখলের বিষয়টি স্বীকার করলেও কিভাবে পেয়েছেন সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। বিআইডব্লিউটিএর জমি দখলে রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আজিজুল হক আক্কাসের ভাই শেলী ছাড়াও পল্টু মিয়া, সেন্টু মিয়া, ফিরোজ হোসেন ওরফে মাছ ফিরোজ, নাজিম খন্দকার, মনু বাবু, জয়নাল হাজারীসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী। তবে তাঁদের নাম দখলবাজদের তালিকায় নেই।

সহকারী কমিশনার ভূমি বরিশাল সদরের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার জালাল আহমেদ জানান, চরবদনা মৌজায় বিআইডব্লিউটিএর জমি রয়েছে। তবে এর কোনো কাগজপত্র ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে নেই। শুনেছি এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান, তাই নথি আদালত নিয়ে গেছেন।

নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানান, অপসোনিন কম্পানির ভবনের অর্ধেক অংশ কীর্তনখোলা নদীর তীরে রয়েছে। তবে ভূমি অফিসে অপসোনিন কম্পানির অবকাঠামো যে  দাগগুলোর মধ্যে অবস্থান সেখানে নলছিটি নদী দেখানো হয়েছে। বিষয়টি কিভাবে হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আমার জানা নেই। আমি কাগজে এমনটি দেখেছি।

নদী-খাল রক্ষা কমিটি বরিশাল জেলার সভাপতি কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা শুনেছি বিআইডব্লিউটিএ কীর্তনখোলা নদীর দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করেছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ওই তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। কারণ তালিকায় যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাঁরা সবাই দখলদারদের ভাড়াটিয়া। কীর্তনখোলা নদী মূলত দখল করেছে অপসোনিন ফার্মা, সাবেক চিপ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হীরণসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কয়েকজন সার্ভেয়ার। তালিকায় যাঁদের দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে তাঁরা সবাই ভাড়াটিয়া।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিউটিএর একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার বিআইডব্লিউটিএর জমি পরিদর্শন করেছি। রসুলপুরে এক হাজার ২০০ ও মোহাম্মদপুরে এক হাজার, দপদপিয়ায় এক হাজার ও চাঁদমারী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ৯০০-এর মতো দখলদারকে পেয়েছি। তবে তাঁরা জমি দখল করেছেন কি না সে বিষয়টি আমরা জানি না। আমরা উপস্থিত থেকে নাম লিখে এনেছি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০২১ সালে সর্বশেষ যখন আমরা সার্ভে করতে যাই, তখন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ, বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান খান কামাল, মাইনুল ইসলাম, এবায়দুল হক চানের ভাই লাল মিয়াসহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। পরে ওই তালিকা ধামাচাপা পড়ে যায়।

তবে বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান ইমন জানান, শুনেছি ২০১৯ সালে দখলদারদের তালিকা করা হয়েছে। তবে সেই তালিকার কোনো অস্তিত্ব নেই এবং আমি পাইনি। তবে তাঁদের জমি দখল হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি। তিনি বলেন, নগরের আমানতগঞ্জ খাল থেকে রূপাতলী দক্ষিণ পাশ পর্যন্ত ৩.৫৭০ কিলোমিটার কীর্তনখোলার তীর বিআইডব্লিউটিএর। নদীতীরের দিকে ৫০ গজ পর্যন্ত উভয় তীরে ৩৬.৩০ কিলোমিটার ফোরশো আছে, যার অর্ধেকই বেদখল হয়ে গেছে। কতটুকু পরিমাণ জমি বেদখল রয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের জরিপ চলছে। তবে জমি উদ্ধারের বিষয় সন্ধিহান তিনি। কারণ জেলা প্রশাসন উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও তারাই ওই জমি বন্দোবস্ত দিচ্ছে বলে চাউর রয়েছে।