মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত কার্যত ‘শেষ’ হয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদনের যে নির্ধারিত সময়সীমা রয়েছে, তা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেও তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যদিও অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এখনো বজায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধ বা বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়; অন্যথায় সেই অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য থাকে প্রশাসন। তবে ট্রাম্প কংগ্রেসকে দেওয়া এক চিঠিতে দাবি করেন, গত মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের সঙ্গে সক্রিয় শত্রুতা শেষ হয়েছে, তাই এই আইনগত বাধ্যবাধকতা এখন আর প্রযোজ্য নয়। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ইরান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যদিও তার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ায় কার্যকর ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড তার সামনে বিভিন্ন বিকল্প রেখেছেÑকূটনৈতিক সমাধান থেকে শুরু করে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলার সম্ভাবনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানকে কোনো ধরনের টোল প্রদান করলে তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের ভেতরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলছেন, যুদ্ধবিরতি থাকলেও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নিÑএ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে কংগ্রেসে ভোট হওয়া উচিত কি না। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও একই মত দিচ্ছেন। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি মানেই সংঘাতের সমাপ্তি নয়; তাই আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো কার্যকর থাকতে পারে।
যুদ্ধের মাধ্যমে তেল ও শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন প্রশাসন : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপ কি তবে সুপরিকল্পিতভাবে শেয়ার বাজারকে কেন্দ্র করে সাজানো হচ্ছে? সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এবং বিশ্ববাজারের উঠানামা বিশ্লেষণ করে এমনটাই দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বার্তা সংস্থা বিবিসি’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ভোরে ইরান হামলা শুরু করা হয়েছিল অত্যন্ত সুক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ করে। ওই সময় এশিয়ার বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেট বন্ধ থাকায় টানা ৩৬ ঘণ্টা হামলার সুযোগ পায় ওয়াশিংটন, যার ফলে সোমবার বাজার খোলার আগেই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার সুযোগ পায় বিনিয়োগকারীরা। এমনকি ওই সপ্তাহান্তে বিটকয়েনের অস্বাভাবিক উত্থানও অনেককে বিস্মিত করেছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন তেলের দাম বৃদ্ধি এবং স্টক মার্কেটে ধস শুরু হয়, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে দাবি করেন যে যুদ্ধ ‘শিডিউলের চেয়েও আগে’ শেষ হবে। তার এই মন্তব্যের পরপরই এসএন্ডপি ইনডেক্স ঘুরে দাঁড়ায় এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
২০২৬ সালের মে মাসের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের জ্বালানি নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা (ইরান যুদ্ধ) বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্পের বক্তব্য ও ভেনেজুয়েলা বা মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত পদক্ষেপের পর মার্কিন তেল শেয়ারের দর ওঠানামা করছে। ইরান কর্তৃক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলারের এক রহস্যময় লেনদেনের তথ্য ফাঁস হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার মাত্র ২০ মিনিট আগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিশোধিত তেলের দাম কমার পক্ষে এই বিশাল বাজি ধরেন। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের তথ্যানুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় ১২:২৪ থেকে ১২:২৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে একাধিক বিনিয়োগকারী প্রায় ৭,৯৯০ লট ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার বিক্রি করে দেন। এই লেনদেনের সময়োচিত ধরন দেখে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি স্যাম লিকার্ডো একে ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বা আগাম তথ্য ফাঁসের ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এ বিষয়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পল অ্যাটকিনসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছেন।
এদিকে, এই ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের অসারতা তুলে ধরে বলেন, তেলের একটি নিজস্ব বাস্তব বাজারমূল্য রয়েছে, যা শিপমেন্টের মাধ্যমে প্রমাণিত। কিন্তু মার্কিন ট্রেজারি বা সরকারি বন্ডগুলো বর্তমানে কেবল ‘অনুমান’ বা ‘সেন্টিমেন্টের’ ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। গালিবাফ আরও অভিযোগ করেন যে, ওয়াল স্ট্রিটের কিছু অসাধু চক্র তেহরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং তিনি এই চক্রের মুখোশ উন্মোচন করারও হুঁশিয়ারি দেন।
ট্রাম্প এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার হুমকি দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে পরের দিন সুর নরম করে তিনি একে ‘অস্তিত্বহীন কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ডিগবাজির ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায় এবং অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মার্কেটে ব্যাপক দরপতন ঘটে। বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ট্রাম্পের সেই পুরোনো রণকৌশল হিসেবে দেখছেন, যেখানে তিনি প্রথমে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং পরে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পিছু হটেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ইরানে হামলা নিয়ে ইরাক কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বেশি ক্ষুব্ধ মার্কিনিরা : ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্তকে একটি বড় ‘ভুল’ হিসেবে দেখছেন অধিকাংশ মার্কিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি-ইপসোস এর এক যৌথ জরিপে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক ইরানের ওপর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ এই হামলাকে সঠিক বলে সমর্থন করেছেন। জরিপে আরও দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধকে সফল মনে করছেন না। প্রায় ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা একে ‘অসফল’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মাত্র ১৯ শতাংশ একে সফল দাবি করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা এখন ২০০৬ সালের ইরাক যুদ্ধ বা ৭০-এর দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের চাইতেও নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হ্রাসের মুখে রয়েছে।
১৬ মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস, নতুন প্রতিবেদনে প্রকাশ : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মাঝে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশে অবস্থিত অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ইরানের হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে, বেশ কিছু ঘাঁটি বর্তমানে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সিএনএন-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ইমেজ এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের বরাতে জানানো হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে ইরান মূলত আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সরঞ্জামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত রাডার সিস্টেম, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতের ‘ক্যাম্প বার্লিং’ এবং ‘আলি আল সালেম’ এয়ার বেস, সউদী আরবের ‘প্রিন্স সুলতান’ এয়ার বেস এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধুমাত্র বাহরাইনের নৌ-ঘাঁটি মেরামতেই প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসের একজন সহকারী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যে কৌশলগত অবস্থান রয়েছে, তার সিংহভাগই এখন ঝুঁকির মুখে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ হিসাব মতে, এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং যুদ্ধ পরিচালনা বাবদ এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার নির্ভুলতা প্রমাণ করে যে ইরান উন্নতমানের স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করছে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ইরানের : মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী এবং পারস্য উপসাগরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) এই অঞ্চলের জলসীমায় নতুন কিছু নিয়ম কার্যকর করার কথা জানিয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে জানা গেছে, আইআরজিসি নেভি কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা ইরানের দক্ষিণ উপকূলের প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এর মধ্যে পারস্য উপসাগর এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো এই জলসীমাকে ইরানি জনগণের জন্য ‘গর্ব ও শক্তির উৎস’ এবং অঞ্চলের জন্য ‘নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা।
এদিকে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান উত্তেজনা নিরসন এবং অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের লক্ষ্যেই এই নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তেহরান তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে পারমাণবিক আলোচনার বিষয়টিকে চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য জমা রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে তারা প্রথমে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত ইরানের এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া ওয়াশিংটন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও ইরানের এই নমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ডের মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ : মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড অঞ্চলটি ত্যাগ করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রণতরিটির প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রায় ১০ মাসের মোতায়েন শেষে এটি এখন নিজ ঘাঁটির দিকে ফিরে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে রণতরিটি ইরান-সংক্রান্ত সামরিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ভূমিকা রেখেছিল বলে জানা যায়। তবে ফোর্ড চলে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের আরও দুটি বিমানবাহী রণতরি, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, এখনো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। ফলে অঞ্চলটিতে মার্কিন নৌ উপস্থিতি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বজায় আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ধাপে ধাপে উন্মুক্ত : দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ধাপে ধাপে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর আকাশপথ স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও যাত্রীদের ভোগান্তি এখনই কমছে না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার যাত্রীরা ফিরতি ফ্লাইটে দীর্ঘ সময় এবং টিকিটের সংকটের মুখে পড়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আকাশসীমায় বিমান চলাচলের ওপর আরোপিত সকল সাময়িক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। দেশটির জেনারেল সিভিল এভিয়েশন অথরিটি নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমানে পুরো দেশের আকাশপথ নিরাপদ এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ এবং ‘ভিসা এইচকিউ’-এর তথ্যমতে, আমিরাতের মতো বড় এয়ারলাইন্সগুলো তাদের সক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশ ফিরিয়ে এনেছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রুট পরিবর্তন করার ফলে ভারত বা বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী ফ্লাইটে অতিরিক্ত ১ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় বেশি লাগছে। ১ মে থেকে কাতার এয়ারওয়েজ কেরালাসহ কিছু নির্দিষ্ট রুটে পরিষেবা পুনরায় চালু করলেও সিট পাওয়া যাচ্ছে খুবই সীমিত। তবে ইরান অভিমুখে ফ্লাইটগুলো আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এছাড়া ইরাক, লেবানন, কুয়েত এবং কাতারগামী বেশ কিছু রুটে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হতে পারে। সূত্র : গালফ নিউজ, আল-জাজিরা, বিবিসি, বিজনেস ইনসাইডার, নিউ রিপাবলিক।