Image description

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতার ঘাটতি চরমভাবে ভোগাচ্ছে দেশের শিল্প খাতকে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সক্ষমতা কমেছে। সেইসঙ্গে গতি কমেছে পণ্য পরিবহনেও। এতে ক্রেতাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা কর্মসংস্থানসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী তেল ও পণ্য পরিবহন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানির পাশাপাশি কাঁচামালের দাম হু-হু করে বেড়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। যদিও সরকার শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করে ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। লিটারপ্রতি ডিজেলে ১৫ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা এবং পেট্রোলে ১৯ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনো জ্বালানি তেলে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। তার ওপর দিনভর বিদ্যুৎ বিভ্রাট সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যখন বিশ্ববাজার অস্থির, তখন তার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। মধ্যপ্রাচ্যের এ উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে। শিল্প খাতের কাঁচামালের আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে; দামও বেড়েছে। দেশি ও বিদেশি বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয়েছে; বাণিজ্যও কমছে। এর মধ্যে সরকার জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে; কিন্তু সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট রয়েছে। এরই মধ্যে আমাদের শিল্প খাতগুলোতে এসবের নেতিবাচক প্রভাবগুলো দেখতে পারছি।

তিনি আরও বলেন, রিরোলিং মিল থেকে আরম্ভ করে সিমেন্ট, প্লাস্টিক, ওষুধ, পোশাক—সব শিল্পেই উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো খাতে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। উৎপাদন ও লজিস্টিক ব্যয় অনেক বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকসান হচ্ছে। শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগও কম করছেন উদ্যোক্তারা। আলটিমেটলি কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে। এ কর্মসংস্থান ও শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরেই কিন্তু ৫ আগস্ট দেখলাম আমরা। বর্তমান সরকারের এজেন্ডা ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান করা। শিল্প খাতে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বর্তমান সংকট আরও দীর্ঘায়িত হলে শুধু কর্মসংস্থান না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করবে। এটি মোকাবিলায় সরকার চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদেরও সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। যেসব সংস্কার প্রয়োজন সেগুলো হওয়া দরকার এবং তার সুফল যেন মানুষ উপভোগ করতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে।

উৎপাদনের গতি ও রপ্তানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পোশাক খাত:

দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাতে উৎপাদন ব্যয়ও ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, একটি কারখানা যেখানে দিনের বেলায় সাধারণত ১০ ঘণ্টা কার্যক্রম চালায়, সেখানে শিল্প এলাকাগুলোতে এখন প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে আশুলিয়া, ভালুকা, শ্রীপুর বা রাজেন্দ্রপুরের মতো পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় লোডশেডিংয়ের সমস্যা আরও প্রকট। বিদ্যুৎ চলে গেলে জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর চালাতেও বিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। এতে উৎপাদনের গতি ধরে রাখা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে কথা হলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালবেলাকে বলেন, জ্বালানির সরবরাহ এখনো সেভাবে বাড়েনি। তার ওপর বিদ্যুৎ বিভ্রাট সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। রপ্তানি নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, আমরা খুব শঙ্কিত যে, সামনের দিনগুলোতে কী হবে। যুদ্ধ যদি না থামে, আশঙ্কায় আছি আমাদের রপ্তানি আরও কমে যাবে। কারণ, বায়াররাও শঙ্কিত যে, এ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে অর্ডার প্লেস করলে সেই অর্ডার সময়মতো তারা পাবে কি না। যার ফলে সুবিধাজনক জায়গায় তারা তাদের অধিকাংশ অর্ডার প্লেস করছে। এতে আমাদের ক্রয়াদেশ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

চামড়া খাতে লম্বা সময় বন্ধ থাকছে ট্যানারি:

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে নাজেহাল চামড়া শিল্পও। ট্যানারি শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দিনের লম্বা সময় ধরে কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে উৎপাদন ও সংরক্ষণ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের এ ক্ষতি এড়াতে অনেক কারখানা সাময়িক বন্ধ থাকছে। শিল্পমালিকরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন কোরবানির মৌসুমের উপরেও বড় প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ কালবেলাকে বলেন, সাভার শিল্প এলাকার কারখানাগুলো গত সপ্তাহে দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে ছিল। চামড়া উৎপাদনে ১৬ এবং ৭২ ঘণ্টার দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রক্রিয়া চলাকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়। জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি তেল এখনো সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া জেনারেটর দিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি পুরোদমে চালু রাখা যায় না। ফলে ট্যানারি মালিকরা ক্ষতি এড়াতে কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছেন। আমার নিজের কারখানাই এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে আমাদের উৎপাদন ৬০ শতাংশ কমে গেছে।

প্লাস্টিক কারখানায় বাড়ছে কাঁচামালের অপচয়:

বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কাঁচামালের অপচয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্লাস্টিক খাত। উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান বাজারে প্লাস্টিকের প্রধান কাঁচামালগুলোর দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কারখানাগুলোতে সেই কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামিম আহমেদ কালবেলাকে বলেন, প্লাস্টিক কারখানগুলোতে মেশিনে কাঁচামাল থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে গেলে তা আর কাজে আসে না। পুরোটাই ফেলে দিতে হয়। গাজিপুরের দিকে আমাদের অনেকগুলো কারখানা রয়েছে। সেখানে বর্তমানে দিনে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে কারখানাগুলোতে অপচয়ের পরিমাণ বাড়ছে। কাঁচামালের দাম যেখানে অত্যধিক বেড়েছে, সেখানে এ অপচয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভারী যন্ত্রপাতি চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সিমেন্ট খাত:

প্লাস্টিক খাতের মতো সিমেন্ট খাতেও কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের নিয়মিত সরবরাহ না পাওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সিমেন্ট কারখানাগুলো। এতে কারখানাগুলোর সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। পণ্য পরিবহনও বিঘ্নিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স) মাসুদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, একদিকে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। শিপমেন্টের ভাড়াও টনপ্রতি ৮ থেকে ১৪ ডলার বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেল পাচ্ছি না। সিমেন্ট কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি সব ডিজেলে চলে, যা প্রায়ই জ্বালানির অভাবে বন্ধ থাকছে। অন্যদিকে, ডিজেলের অভাবে লাইটার জাহাজ চলাচল করতে না পারায় বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেল ওয়েটিংয়ের সময় পাঁচ থেকে ১২ দিন বেড়ে যাচ্ছে; দিতে হচ্ছে বড় অংকের জরিমানা। ফলে বর্তমানে সিমেন্ট কারখানাগুলোতে খরচ বেড়েছে ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, রেভিনিউ কালেকশনও ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। শুধু তা-ই নয়, পণ্য ডেলিভারিও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিজেলের অভাবে আমাদের প্রতিষ্ঠানের ডেলিভারি সক্ষমতা ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে মার্কেট থেকে ক্যাশ ফ্লো কমেছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চান ব্যবসায়ীরা:

সংকট মোকাবিলায় শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোয় গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে গোটা শিল্প খাত হুমকির মুখে পড়বে। শুধু দেশের বাজারে পণ্য সরবরাহ নয়, রপ্তানি খাতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দামের চেয়ে আমাদের কাছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হলে উৎপাদনের গতি ধরে রাখতে হবে। তাই জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চাই আমরা। সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুত এ সমস্যা কেটে যাবে এবং শিল্প খাতগুলোতে আবারও স্বাভাবিক গতি ফিরবে।