Image description

যুক্তরাষ্ট্রের হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় (এইচসিএসও) শুক্রবার জানিয়েছে, গত ২৬শে এপ্রিল উদ্ধার হওয়া মরদেহের খণ্ডিত অংশ ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার নিখোঁজ শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
মার্কিন ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ শনাক্তের খবর দিয়েছে এইচসিএসও।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার বলেন, এই শনাক্তকরণে যেমন উত্তর মিলেছে, তেমনই এতে গভীর শোক হয়েছে। তিনি বলেন, নাহিদা বৃষ্টি এবং জামিল লিমন শুধু শিক্ষার্থীই ছিল না, তারা উদ্যমী ও কৃতী ছিল, তাদের প্রাপ্য ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

গত ১৬ই এপ্রিল বৃষ্টি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন নিখোঁজ হন।
এইচসিএসও জানায়, অ্যাভালন হাইটসে লিমনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাদের তদন্ত শুরু হয়। জামিলের আরও দু’জন রুমমেট ছিল, একজন এই তদন্তে সহযোগিতা করলেও অন্যজন হিশাম আবুঘারবিয়াহ সহযোগিতা করেননি।
তদন্তকারীরা জানান, হিশামের বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অভিযোগ ছিল। ক্রোনিস্টার বলেন, হিশামের বিরক্তিকর আচরণ ও মন্তব্যের কারণে ওই অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে বেশ কয়েকটি অভিযোগ হয়েছিল।

বৃষ্টি ও জামিল নিখোঁজের প্রায় এক সপ্তাহ পর গত ২৩ এপ্রিল শেরিফ ক্রোনিস্টার বলেন, গোয়েন্দারা লিমনের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কাছে একটি ডাস্টবিনের ভেতর থেকে তার রক্তমাখা জিনিসপত্র খুঁজে পায়। এটিই ছিল এই মামলার প্রথম বড় অগ্রগতি।
এরপর গোয়েন্দারা আরও তদন্তের জন্য একটি তল্লাশি ওয়ারেন্ট পান। তারা, লিমনের অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে ও হিশামের শোবার ঘরে রক্তের সন্ধান পান।

শরিফ বলেন, হিশামের বিছানার পাশে মেঝেতে একটি মানুষের অবয়ব দেখা যায়, সেখানে এটি ভ্রূণের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, হিশামের গাড়ি তল্লাশি করে তারা বৃষ্টিরও রক্ত পায়।
এইচএসসিও’র গোয়েন্দারা জানান, হিশামের কেনাকাটার ইতিহাস থেকে জানা যায় তিনি বড় ব্যাগ, ওয়াইপস, লাইটার ফ্লুইড ও একটি লাইটার অর্ডার করেন।

এ ছাড়া এই দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার আগে গোয়েন্দারা হিশামের ফোনে একটি উদ্বেগজনক সার্চ হিস্ট্রিও খুঁজে পান। হিশামের সার্চ হিস্ট্রিতে দেখা যায়, ছুরি খুলি ভেদ করতে পারে কিনা, প্রতিবেশীরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে কিনা ... ময়লার ব্যাগে লাশ ঢুকিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া যায় কিনা- এসব খুঁজেন, বলেন শেরিফ।
এ ছাড়া হিশামের ফোন থেকে তার অবস্থানের ইতিহাসও জানা যায়। এটি-ই গোয়েন্দাদের লিমনের মৃতদেহের কাছে নিয়ে যায়। গত ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছে একটি কালো ব্যাগে লিমনের মরদেহের খণ্ডিত অংশ পাওয়া যায়।

শেরিফ জানান, হাত ও গোড়ালি একসঙ্গে বাঁধা অবস্থায় লিমনকে মৃত পাওয়া যায়। আঙ্গুুলের ছাপ মিলিয়ে গোয়েন্দারা মরদেহটি লিমনের বলে শনাক্ত করেন।
ক্রোনিস্টার বলেন, লিমনের পা দু’টি নিতম্ব পর্যন্ত প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, যাতে সেগুলোকে একসাথে ভাঁজ করে ময়লার ব্যাগে রাখা সহজ হয়।

একই দিনে সন্দেহভাজনের পরিবার লুটজে একটি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার জন্য ৯-১-১ এ ফোন করে। সেই সময়েই হিশামকে হেফাজতে নেয়া হয়।
এরপর এইচসিএসও জানায়, তারা কায়াকাররা ম্যানগ্রোভের ভেতর থেকে একটি কালো ব্যাগে দেহাবশেষ খুঁজে পায়। এটি ছিল লিমনের মরদেহের খণ্ডিত অংশ খুঁজে পাওয়া অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গা।
ফৌজদারি প্রতিবেদনের হলফনামা অনুসারে, গত ২৬শে এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণে পাওয়া মৃতদেহের পোশাকের সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে শেষবার বৃষ্টিকে দেখা যাওয়া তার পরনে থাকা পোশাকের মিল রয়েছে।

হলফনামায় আরও বলা হয়, ভিডিওতে বৃষ্টিকে শেষবার যে পোশাকে দেখা যায়, মৃতদেহটিও সেই একই ধরনের পোশাকে সজ্জিত ছিল। অবশেষে ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে এসে হিসলবরো কাউন্টি শেরিফ নিশ্চিত করেন, গত রোববার উদ্ধার খণ্ডিত মরদেহটি বৃষ্টির।
শেরিফ জানান, বৃষ্টির মরদেহের অবস্থার কারণে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে তার দাঁতের রেকর্ড এবং ডিএনএ’র জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শেষমেশ এটি ৩০শে এপ্রিল সম্পন্ন করেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃষ্টি ও লিমনকে একই সময়ে হত্যা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী মার্কিনি হিশামকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে সর্বশেষ, লিমনের পাশাপাশি বৃষ্টির মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ফ্লোরিডাতে লিমনের জানাজা সম্পন্ন, মরদেহ দেশে পৌঁছাবে রোববার
ওদিকে সিদ্দিকুর রহমান সুমন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জানান, ফ্লোরিডাতে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের জানাজা নামাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় ইসলামিক সোসাইটি অব টামপা বে এরিয়াতে অনুষ্ঠিত জানাজায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন স্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এতে ইমামতি করেন ইসলামিক সোসাইটি অব টামপা বে-এর ইমাম আরজান আহমেসুলা।
জানাজার পূর্বে জামিল লিমনের মরদেহ মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ উপস্থিত অনেকে অবিলম্বে নাহিদা বৃষ্টির লাশের সন্ধান এবং খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

জানাজার পর স্থানীয় একটি মিলনায়তনে নিহত লিমন এবং বৃষ্টির পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় কমিউনিটির উদ্যোগে ফান্ড সংগ্রহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফান্ড সংগ্রহে ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

এদিকে জামিল-লিমনের মরদেহ আগামী রোববার (৪ঠা মে) ঢাকায় পৌঁছাবে। স্থানীয় সময় শনিবার (২রা মে) যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে রোববার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে মরদেহবাহী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি ঢাকা অবতরণ করবে বলে জানা গেছে। পথে দুবাই এ ট্রানজিট থাকবে। ওয়াশিংটন ডিসিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেহ দেশে পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

গত ১৬ই এপ্রিল থেকে (বৃহস্পতিবার) নিখোঁজ ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারকৃত জামিলের রুমমেট হিশামের তথ্যে গত শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে জামিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর হিশামের বাসা থেকেই নাহিদা বৃষ্টির মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, লিমনের শরীরে অসংখ্য জখম ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।

উল্লেখ্য, জামালপুর জেলার জামিল লিমন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নাহিদা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। লিমন ২০২৪ সালে এবং বৃষ্টি ২০২৫ সালে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডাতে ভর্তি হয়েছিলেন।