দুই কলেজছাত্র হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাদশা মিয়া ২০২২ সালে ঢাকার আদালত চত্বর থেকে পালিয়ে যায়। সেই ঘটনার পর কেটে গেছে চার বছর। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস মেলেনি। শুধু বাদশা মিয়া নয়, গত কয়েক বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার আদালত থেকে বেশ কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পালিয়ে যায়। তাদের দু’-একজন ধরা পড়লেও বাকিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পলাতক অবস্থান থেকে ভিকটিমের পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন আসামিরা।
আদালত সূত্র জানায়, আসামিদের আদালতে হাজিরার সময়ই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো, আদালত কক্ষে নেয়া কিংবা হাজতখানায় প্রবেশের সময় পালিয়ে যায় আসামিরা। অনেক ক্ষেত্রে আদালত প্রাঙ্গণের ভিড় ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। এ বিষয়ে সাবেক বিচারক ড. আবুল হোসেন খন্দকার মানবজমিনকে বলেন, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ আসামিদের ক্ষেত্রে যে ধরনের কঠোর নিরাপত্তা থাকার কথা, বাস্তবে তার ঘাটতি স্পষ্ট।
জনবল সংকট, সমন্বয়ের অভাব, দায়িত্বে অবহেলা-সব মিলিয়েই বারবার ঘটছে এমন ঘটনা। তিনি বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, সিসিটিভি’র কার্যকর ব্যবহার, বডি ক্যামেরা ও জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা জরুরি। আসামি পরিবহনে আলাদা নিরাপত্তা ইউনিট ও কঠোর প্রটোকল বাস্তবায়নেরও বিকল্প নেই। আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নীতিবিশ্লেষক এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম মানবজমিনকে বলেন, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা বিচার ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান মানবজমিনকে বলেন, অতীতের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি তার অধীনস্ত সংশ্লিষ্টদের সতর্কতার সঙ্গে আসামি হ্যান্ডেলিং করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
যেভাবে পালিয়েছে আসামিরা: গেল বছরের ২২শে অক্টোবর ঢাকা মহানগরীর কোতোয়ালি থানাধীন সিএমএম আদালত ভবন থেকে চার মামলার এক আসামি হাতকড়া খুলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সিএমএম কোর্ট হাজতখানা থেকে গুলশান থানার একটি মামলার আসামি রুবেল আহম্মেদ (৩৮)-কে আদালতে নেয়ার জন্য বের করা হয়। তার হাতে হাতকড়া ও রশি পরানো ছিল। পরবর্তীতে দুপুর আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে আদালত ভবনের ১০ম তলায় রেকর্ড রুমের পাশের বাথরুমে যাওয়ার কথা জানালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য তার হাতকড়া খুলে দেয়। এ সুযোগে আসামি বাথরুম থেকে কৌশলে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আদালত এলাকা ও আশপাশে তল্লাশি চালালেও পলাতক আসামির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
একই বছরের ১৯শে জুন এক পুলিশ সদস্যকে কামড় দিয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যায় হত্যা মামলার আসামি শরীফুল ইসলাম। খিলগাঁও থানায় করা একটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। ছয় বছর ধরে কারাগারে ছিলেন। মামলার শুনানির দিন ধার্য থাকায় তাকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছিল। দুপুরের দিকে আদালতে শুনানি শেষে তাকে যখন হাজতখানায় নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন পুলিশ কনস্টেবল শহীদুল ইসলামের হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যান তিনি। ঘটনার তিন মাস পরে ৩০শে সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ১৯শে মে যশোরে আদালত থেকে হাজতখানায় নেয়ার পথে জুয়েল খান নামে হত্যা মামলার এক আসামি যশোর জেলা দায়রা জজ আদালত থেকে হ্যান্ডকাফসহ পালিয়ে যায়।
একই বছরের ১৪ই জুলাই নরসিংদীতে চুরির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি নরসিংদীর জেলা জজ আদালতের (ম্যাজিস্ট্রেট) কোর্টের কাঠগড়া থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পলায়নকারী আসামি রিয়াজুল ইসলাম হৃদয় (২৫) নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার বালুয়াকান্দি গ্রামের দানা মিয়ার ছেলে। নরসিংদী জজ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. সাইরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আক্তার শিফার এজলাসে লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে কাঠগড়ায় অবস্থানরত অটোরিকশা চুরির মামলার একমাত্র সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি রিয়াজুল ইসলাম হৃদয় পালিয়ে যায়।
গত বছরের ১১ই ডিসেম্বর বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বর থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় শাহীন ওরফে মিরপুর (২০)। আদালত সূত্র জানায়, আদালতে হাজিরার পর তাকে প্রিজন ভ্যানে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময় হাতকড়া খুলে দ্রুত দৌড়ে আদালত এলাকা থেকে পালিয়ে যায় শাহীন। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে না পারায় মুহূর্তের মধ্যেই সে উধাও হয়ে যায়। দুই কলেজছাত্র সাভারের মুনসের আলী মুন্না ও মানিকগঞ্জের মনির হোসেন হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি বাদশা মিয়া আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। বরং পলাতক অবস্থায় থেকেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এতে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থীর পরিবার।
আদালত সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২৮শে এপ্রিল সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী মুন্না হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য ছিল।
এ মামলার ৬ আসামির মধ্যে বাদশা মিয়া ও লাল মিয়া কারাগারে ছিলেন। ওইদিন তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। মামলার শুনানির আগে ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দা মিনহাজ উম মুনীরার আদালতে তাদের হাজির করা হয়। এদিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়ায় তাদের আদালত ভবনের ৫ তলার এজলাস থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নিয়ে আসতে থাকে কর্তব্যরত পুলিশ। কিন্তু আদালতের তৃতীয় তলায় আসার পর হঠাৎ বাদশা মিয়া এক পুলিশ কনস্টেবলের হাত থেকে কৌশলে ছুটে চলে যায়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা হয়। কিন্ত ৪ বছরেও ওই আসামিকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।