যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ‘সম্ভবত’ আবারও শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছে ইরান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো নতুন দুঃসাহসিকতা বা বোকামির জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তারা। অপরদিকে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা নতুন এক সংকটময় অবস্থায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখনো চালু আছে। তা সত্ত্বেও প্রায় তিন সপ্তাহের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে পাল্টা-পাল্টি ব্যবস্থার হুমকির পর রেকর্ড দামের সাক্ষী হয়েছে অপরিশোধিত তেলের বাজার।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ‘সম্ভবত’ আবার শুরু হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, এটি প্রমাণিত। বিবৃতিতে সামরিক সদর দপ্তরের উপপ্রধান মোহাম্মদ জাফর আসাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য মূলত মিডিয়া-নির্ভর। তাদের লক্ষ্য তেলের দামের পতন ঠেকানো এবং দ্বিতীয়ত নিজেদের সৃষ্ট জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসা।
অবিস্ফোরিত বোমা সরাতে গিয়ে বিস্ফোরণে আইআরজিসির ১৪ জন সদস্য নিহত : ইরানের বার্তা সংস্থা পার্সটুডে গতকাল জানায়, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানের যানজান প্রদেশে মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে তাদের ১৪ জন সদস্য শহীদ এবং দুজন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার আইআরজিসির বিশেষজ্ঞ দল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলা শনাক্ত করে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছিল। এ সময় একটি অবিস্ফোরিত বোমা হঠাৎ বিস্ফোরিত হলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে আইআরজিসি এক বিবৃতির বরাতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ক্লাস্টার বোমা ও অন্যান্য বিস্ফোরক ব্যবহারের কারণে যানজানের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে প্রায় ১,২০০ হেক্টরের বেশি এলাকা, যার মধ্যে কৃষিজমিও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইআরজিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলগুলো ঝুঁকি নিয়ে এসব বিস্ফোরক শনাক্ত ও অপসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। বিবৃতিতে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সেবায় তাদের অঙ্গীকার অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান : এদিকে আল-জাজিরা জানায়, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা সংলাপের জন্য ইরানের তিন ধাপের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে ইরান। তবে ওই প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ হয়নি। এ বিষয়ে দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গণমাধ্যম বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল জাজিরাকে বলেন, দেশ দুটির মধ্যকার পাল্টাপাল্টি এবং ভিন্ন চাহিদার কারণে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা এক গভীর অচলাবস্থায় আটকে রয়েছে। শনিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষের মধ্যকার পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং তারা এখনো আগের অবস্থানেই স্থির হয়ে আছে। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, চলমান সংকট নিরসনে ইরান তাদের পক্ষ থেকে ১০টি দাবির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ১৫টি দাবির তালিকা। এই দুটি তালিকা যখন পাশাপাশি রেখে তুলনা করা হয়, তখন খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে দুই দেশের চাওয়া ও লক্ষ্যের মধ্যে একটি বিশাল দূরত্ব রয়েছে। আর এই কারণেই বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়াটা কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়।
অবরোধের অবসান ঘটার আশঙ্কায় ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান : ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল চালু হবে এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের অবসান ঘটবে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে যে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক আলোচনা আপাতত পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে। তেহরান বিশ্বাস করে যে, পারমাণবিক আলোচনা আপাতত পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখার এই প্রস্তাব একটি বড় ধরনের পরিবর্তন, যা একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
হরমুজ প্রণালিতে ‘নতুন নিয়ম’ ঘোষণা ইরানের : এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে ‘নতুন নিয়ম’ ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানায়, আইআরজিসি নৌ শাখার কমান্ড থেকে এক বিবৃতিতে ‘নতুন নিয়ম’ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, আরব উপসাগর থেকে শুরু করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত ইরানের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বলয় গড়ে তোলা হবে। এই জলসীমাকে ইরানের মানুষের জন্য ‘গর্ব ও শক্তির উৎস’ এবং এই অঞ্চলের ‘নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আইআরজিসি এই ঘোষণার একদিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছিলেন, যারা আরব উপসাগর নিয়ে নীলনকশা সাজাচ্ছে, সেই বিদেশিদের এই অঞ্চলে কোনো জায়গা হবে না, সমুদ্রের তলদেশ ছাড়া তার কোথাও ঠাঁই হবে না।
বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের বাজার চড়ছে : হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা ও ইরানের পাল্টা ব্যবস্থার হুমকির পর গত বৃহস্পতিবার রেকর্ড দামের সাক্ষী হয়েছে অপরিশোধিত তেলের বাজার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে গতকাল ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে ওঠে। তবে দুপুরের পর কিছুটা কমে যায়। গত চার বছরের মধ্যে এমন রেকর্ড দামের পর মে মাসের শুরুতে বিনিয়োগকারীরা নতুন হিসাব কষতে শুরু করেছেন। এর মধ্যেই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে অ্যাক্সিওসের একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর জ্বালানির বিশ্ববাজারে নতুন করে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্রিফ করবেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।
বিপরীতে তেহরানও কৌশলগত জলপথটিতে ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির শঙ্কায় মে মাসে ধীরে চলার নীতি নিয়েছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিম রিড এএফপিকে বলেছেন, সংঘাত ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দামও বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা ধরে নিয়েই বাজারের হিসাব কষছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাকে হত্যা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ওই অঞ্চলে এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ যুদ্ধের পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাকযুদ্ধ হলেও হামলা থেকে বিরত থাকে দুই পক্ষ। পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রায় ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।