Image description
তালিকাভুক্ত ১০১ দখলদার বহাল তবিয়তে

বড়ালের উৎসমুখে ১৯৮৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মাণ করে স্লুইস গেট। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে দুই পাশ দখল, দূষণে বড়াল নদ মরা খালে পরিণত হয়। বড়ালের নাব্য ফেরাতে ৪০ বছর পর গত বছরের জুনে জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। তারপরও নাব্য ফেরেনি। এখন শুরু হয়েছে দখলের মচ্ছব। ছোট দোকান, শৌচাগার থেকে শুরু করে পৌরসভার মার্কেট গড়ে তুলে দখল করা হয়েছে বড়াল নদ। গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় দিনের পর দিন চলছে দখলের মহাযজ্ঞ। ভূমি অফিসের তালিকায় রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলার এমন ১০১ জনের নামও উঠে এসেছে। দখলের শীর্ষে সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তালিকায় নেই এদের নাম। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নদীরক্ষা আন্দোলনের সদস্যসহ স্থানীয়রা।

বড়াল মৃত্যুর আয়োজন শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। ওই সময় বড়ালের উৎসমুখে মাত্র তিন কপাটবিশিষ্ট একটি স্লুইস গেট নির্মিত হয়। তখন থেকেই বর্ষাকালে পানিপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং স্লুইস গেটের মুখে পলিপতন ঘটে। পদ্মা নদী থেকে বড়াল নদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নদটি এখন মরা বড়াল নামেই বেশি পরিচিত। দুই তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ভবন, মার্কেট, গণশৌচাগারসহ নানা স্থাপনা। পা ফেলার জায়গা নেই, উৎকট গন্ধে টেকা দায়। বড়াল দখলমুক্ত করতে ২০০৫ সাল থেকে কয়েক দফা দখলদারদের তালিকা করা হয়। রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে দুই দশকেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন দখলদার। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বাড়ি বাঘার আড়ানী পৌরসভার রামচন্দ্রপুর এলাকায়। 

তাঁর প্রভাবেই ৩০ শতক জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা নওশাদ আলী। এ ছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাহাতাব আলী, আশরাফুল আলী, রানা ইসলাম ও জসিম উদ্দিনও নদের জায়গা দখল করে স্থাপনা করেছেন। গত ৫ আগস্টের পর আড়ানী সেতুসংলগ্ন জায়গায় তিন শতক জায়গা দখল করে পাকা পিলার তুলে দোকানঘর নির্মাণ করছেন ছাত্রদল নেতা রকি ইসলাম। স্থানীয় প্রশাসন একাধিকবার অভিযান চালালে কাজ বন্ধ করেননি তিনি। রকি বলেন, ‘বাজারে বসার জায়গা নেই, এ জন্য ঘর করছি।’ একই অবস্থা দেখা গেছে চারঘাট উপজেলার বাটিকামারী এলাকায়। স্থানীয় ইমদাদুল ইসলাম ও আবদুর রহমান বড়াল নদ দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন কিছুদিন আগে। তারা বলেন, ‘অনেকেই নদীর পাশে দোকান করেছে, আমরাও করেছি। সরকার চাইলে তখন দেখা যাবে।’ ২০০৫ সালে বড়াল নদের দুই পারের ৬৮ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়। ২০০৮ সালে সেই তালিকা হালনাগাদ করে ১১৩ জন চিহ্নিত করা হয়। ২০১৯ সালে আবারও সরেজমিন পরিদর্শন করে ৫৬ জনের তালিকা করা হয়। প্রতিবার তালিকা হালনাগাদ করার পর তাদের উচ্ছেদের জন্য ২০ বছরে কয়েক দফা নোটিস দেওয়া হয়েছে। 

২০১৯ সালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) প্রধান করে উচ্ছেদ কমিটিও গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক চাপে শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ তালিকায় ১০১ জনকে দখলদার বলা হয়েছে। গত বছরের মার্চ মাসে চারঘাট উপজেলা ভূমি অফিসের কাছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দখলদারদের হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিল। সে নির্দেশনা অনুযায়ী বড়ালের উৎসমুখের ১০১ জনের তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।  রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য জামাত খান বলেন, বড়ালের প্রাণ ফেরাতে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, দখলদারদের উচ্ছেদ না করলে সব প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘স্লুইস গেট অপসারণ হয়েছে। বড়ালের দুই পার দখলমুক্ত করতে কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি। বড়াল রক্ষায় আমরা সাতটি উপজেলা থেকে লিখিত আবেদন করছি।’ রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘স্লুইস গেটের রেগুলেটর অপসারণ করা হয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া, আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি।’