Image description
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছেন বিল্লাল হোসেন। হাসপাতালের নিচে নামতেই নামসর্বস্ব ইনসাইট ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের মো. মিরাজ নামে এক প্রতিনিধি (দালাল) তাকে ঘিরে ধরেন। ওই হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে ডাক্তারের দেওয়া টেস্টগুলো করিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখান। এক পর্যায়ে তিনি রাজি হন টেস্টগুলো করাতে। রাজধানীর মুগদা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। সরেজমিন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব অনিয়ম-দুর্নীতির খবর।

হাসপাতালে এই প্রতিবেদকের কথা হয় টেস্ট করতে যাওয়া বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বহির্বিভাগের ডাক্তার তাকে ১০টি টেস্ট দিয়েছেন। এর মধ্যে হাসপাতালে ৭টি টেস্ট করিয়েছেন। বাকি ৩টি টেস্ট হাসপাতালে প্যাথলজিক্যাল বিভাগের কর্মচারীরা বাইরে থেকে করিয়ে নিতে বললেন। সে জন্য যাচ্ছি টেস্টগুলো করতে।

তিনি বলেন, হাসপাতালের কর্মচারী মামুন এই ভাইকে (দালাল) দেখিয়ে বলেন, তিনি স্বল্প খরচে এবং দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে দিতে পারবেন। আপনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে টেস্টগুলো করে নিতে পারেন। তাহলে রিপোর্টগুলো ডাক্তারকে দেখাতে পারবেন।  কথা হয় আরেক ভুক্তভোগী সলিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, তার স্ত্রী ইয়াসমিন পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। এখন নতুন করে কয়েকটি টেস্ট দিয়েছে কাউন্টার থেকে। এর মধ্যে আয়রন প্রোফাইলের একটি টেস্ট লাল কালি দিয়ে গোল করে দিয়েছে বাইরে থেকে করানোর জন্য। ভবনের ৯ তলা থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হলে এক ব্যক্তি টেস্টের জন্য ডিসকাউন্টের কথা বলে কার্ড ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তিনি পরীক্ষা করাননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই চক্রটিতে শত শত পুরুষ ও মহিলা রয়েছে। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে প্রেসক্রিপশন দেখে রোগীদের স্বল্প খরচে টেস্টগুলো করিয়ে দিতে আশ্বস্ত করেন। শুধু বিল্লাল, সলিম উদ্দিন নন, এরকম শত শত রোগীকে মুগদা হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে দালাল চক্র বাইরের নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট করাতে নিয়ে যায়। সেখানে এই চক্রটি বড় অঙ্কের কমিশন নিয়ে থাকে। এ সেন্টারগুলোতে রিপোর্ট ভালো না আসায় আবার পরীক্ষা করাতে ডাক্তার অনুরোধ করেন কিংবা রিপোর্টের ওপর ভর করে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দিয়ে থাকেন। এতে রোগীর আর্থিক খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

রাজধানীতে অন্যতম এই বৃহৎ হাসপাতালটিতে গ্রাম ও শহরতলি থেকে শত শত মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু অসহায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে বাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী চক্রটি। সেবা নিতে আসা রোগীদের পকেট কাটছে এ চক্রটি। একই সঙ্গে সরকারি এ চিকিৎসা কেন্দ্রটি এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে।

মুগদা হাসপাতালের সামনে নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার : মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে গড়ে উঠেছে নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল। এ সেন্টারগুলোতে পুরোনো মেশিন, নামসর্বস্ব লোকবল দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। হাসপাতালের সামনে সেবা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন সেন্টার, ইনসাইট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জমজম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সান ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিকাস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, আল আকসা ব্ল্যাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন সেন্টার, মুগদা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিনিং সেন্টার, প্রাইমেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার (২১, উত্তর মুগদা), রেইনবো ফিজিওথেরাপি সেন্টারসহ ২০টির বেশি নামসর্বস্ব সেন্টার গড়ে উঠেছে।

চিকিৎসক সংকট : মুগদা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা নগণ্য। এই চিকিৎসক সংকটের সুযোগে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন হাসপাতালের কর্মচারীরা। জরুরি বিভাগে দেখা গেছে, চিকিৎসকের বদলে রোগীদের রক্তচাপ (বিপি) এবং পালস পরীক্ষা করছেন সাধারণ ওয়ার্ড বয় ও আয়া পদের কর্মচারীরা। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ দেওয়ার মতো ধৃষ্টতাও দেখাচ্ছেন তারা। একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাপটে অনেক সময় আমাদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সার্জারি বিভাগে বাইরের ওষুধের দাপট : সরকারি হাসপাতালে সার্জারির অধিকাংশ ওষুধ ও সরঞ্জাম বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও মুগদা হাসপাতালে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে সার্জারি ও অর্থোপেডিক বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ এক ফর্দ ধরিয়ে দেওয়া হয়। তুলা, ব্যান্ডেজ, গজ, স্যালাইন, এমনকি সেলাই করার সুতা পর্যন্ত বাইরের দোকান থেকে কিনে আনতে হয়। রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের স্টোরে পর্যাপ্ত মালামাল থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীরা তা রোগীদের দেন না। পরিবর্তে বাইরের নির্দিষ্ট দোকানের নাম বলে দেওয়া হয়, যেখান থেকে মাল কিনলে তারা কমিশন পান। ফলে বিনামূল্যে অপারেশনের আশা নিয়ে আসা সাধারণ মানুষ হাজার হাজার টাকার বিল মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে ফিরছেন।

শয্যাবাণিজ্য ও নোংরা পরিবেশ : হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় একটি শয্যা বা বেড পাওয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, টাকা বা ‘বকশিশ’ ছাড়া কোনো রোগীকে বেড বরাদ্দ দেওয়া হয় না। ট্রলিতে থাকা মুমূর্ষু রোগীকে দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় ফেলে রাখা হয় যতক্ষণ না কর্মচারীদের তুষ্ট করা হয়। বকশিশের অঙ্ক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করে। টাকা দিয়ে সিট মিললেও সেই সিটের পরিবেশ বর্ণনাতীত।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মুগদা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের হাসপাতালে বিভিন্ন হাসপাতালের মার্কেটিং প্রতিনিধি (দালাল) রয়েছে। এটা অস্বীকার করব না। তবে হাসপাতালের ভিতর আমাদের লোকজন রয়েছে তারাও তদারকি করছে। সর্বোচ্চ কঠোরতা বজায় রাখছি। এ ছাড়া হাসপাতালের বাইরে বা সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে কারা রোগীদের নিয়ে যায়, তা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের এখতিয়ারের বাইরে।

এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দেখবে। এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মান যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের। তবে আমাদের স্টাফ যদি জড়িত থাকে, প্রমাণ পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্জারির সরঞ্জাম বাইরে থেকে কেনানোর বিষয়ে তিনি বলেন,  সরকারিভাবে যে সরবরাহ পাওয়া যায়, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কোনো বিশেষ সরঞ্জাম বা জরুরি ওষুধ না থাকলে তখন রোগীদের স্বজনদের অনুরোধ করা হয় ব্যবস্থা করতে। তবে স্টোরে থাকা অবস্থায় রোগীদের বাইরে পাঠানো হলে তা অপরাধ। তিনি আরও বলেন, এ হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার। কিন্তু সেবা দিতে হয় ১ হাজার রোগীর। জনবল কাঠামো অনুযায়ী অনেক সংকট রয়েছে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি জনবলসহ আর্থিকভাবে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য।