Image description
চার্জশিট দিতে পারছে না দুদক

হাসিনার অনুগত তৎকালীন এয়ার চীফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে পারছে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুই মাসের বেশি সময় ধরে সংস্থাটিতে কোনো কমিশন না থাকায় এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বলা চলে শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই দুর্নীতিবাজ সাবেক কর্মকর্তা। মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তও শেষের দিকে।

কিন্তু কমিশন না থাকায় আইনতঃ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা যাচ্ছে না কমিশনের দফতরে। ফলে বড় ধরনের সুবিধার আওতায় রয়েছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ এই সামরিক কর্মকর্তা। দুদক সূত্র জানিয়েছে এসব তথ্য। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ১৬তম প্রধান ছিলেন এয়ার চীফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান। রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের ১২ জুন তাকে বিমান বাহিনীর শীর্ষ পদে বসান। হাসিনার উপস্থিতিতেই তাকে এয়ার চীফ মার্শাল র‌্যাংক ব্যাজ পরানো হয়। এ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২০২৪ সালের ১১ জুন পর্যন্ত।

বাহিনীর শীর্ষ পদটিতে আসীন হওয়ার পর বেড়ে যায় তার যথেচ্ছাচার। শেখ হাসিনার ‘খাস লোক’ বিধায় তাকে থামানোর কেউ ছিলো না। বাড়ি বাগেরহাট দাবি করলেও তার পৈতৃক নিবাস ছিলো গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। পিতা শেখ আজহারুল ইসলাম এবং মাতা নাজলী ইসলামের ঘরে ১৯৬১ সালের ১ আগস্ট তার জন্ম। এ কারণে শেখ হাসিনার প্রতি তার আনুগত্য ছিলো প্রশ্নাতীত।

বিমান বাহিনীর চীফ মার্শালের দায়িত্বে বসার পর ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ এবং ‘পদোন্নতি বাণিজ্য’র অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বাহিনীর সুনাম ক্ষুণœ করে অবৈধভাবে অর্জিত মাধ্যমে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা কানাডা, কাতার, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে-মর্মে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া দেশেও নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের রয়েছে অভিযোগ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শেখ আব্দুল হান্নান ও তার স্ত্রী-সন্তানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা মেলায় গতবছর ২৭ জুলাই শেখ হান্নান, তার স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে দুদক পৃথক ২টি মামলা করে।

একটি মামলায় শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিমান বাহিনীতে নিয়োগ প্রদান, পদোন্নতি প্রদানের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটিতে তার বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়। বিপুল সম্পদের তথ্য গোপনেরও অভিযোগ আনা হয়। মোট ৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয় মামলায়।

একই মামলায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচারের অভিযোগ এনে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কয়েকটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরেক মামলায় স্ত্রী তাহমিদা বেগমের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। মামলা দু’টি তদন্ত করছেন সংস্থার উপ-পরিচালক তানজির হাসিব সরকার।

মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গত ৩০ মার্চ শেখ আব্দুল হান্নান দম্পতি এবং তাদের পুত্র শেখ লাবিব হান্নানের আয়কর নথি জব্দ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। ফ্রিজ হওয়া অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে শেখ আব্দুল হান্নান, তার স্ত্রী তাহমিদা বেগম এবং পুত্র শেখ লাবিব হান্নানের নামে করা ৩৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে রাজধানীর নিকুঞ্জ এবং মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় ফ্ল্যাট ও জমি। তাদের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে দুদক মহাপরিচালক মো: আখতার হোসেন বলেন, শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগের মামলা রয়েছে। এটি এখন তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন কমিশন এলেই হয়তো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এদিকে দুদকে মামলা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতারের কোনো সংবাদ জানা যায়নি। এ কারণে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, হাসিনার অনুগত,প্রভাবশালী ও মহা দুর্নীতিবাজ শেখ আব্দুল হান্নান এখন কোথায়? তিনি পালিয়ে গেছেন নাকি দেশেই আত্মগোপন করে আছেন? হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় হাসিনা অনুগত অনেক প্রভাবশালীকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের পরবর্তীতে দুর্নীতি মামলায়ও শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়েছে দুদক। অথচ শেখ আব্দুল হান্নানকে গ্রেফতারের কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগেই তিনি শেখ হাসিনার অনুকরণে সপরিবারে দেশত্যাগ করেছেন।