জাতীয় সংসদসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর উগ্রবাদী হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে গোয়েন্দা সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে একটি ‘গোপনীয়’ চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য বোমা হামলা বা সশস্ত্র আক্রমণের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে নিরাপত্তা জোরদার করতে বলা হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন জানিয়েছেন, এখনো কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তার বিষয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি কামরুল আহসানের সই করা একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এই সতর্কতা জারি করা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং অন্যান্য ইউনিটের অন্তত তিনজন কর্মকর্তা শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) এই সতর্কতা বার্তা পাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী আবু বক্কর আবু মোহাম্মদ এর সাথে চাকরিচ্যুত দুই জন সেনাসদস্যের (কপি সংযুক্ত) নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তারা রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানগুলোকে তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সংসদ ভবন ছাড়াও পুলিশ ও সামরিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় তাদের হামলার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া জনাকীর্ণ বিনোদন কেন্দ্রগুলোকেও এই হামলার ঝুঁকির আওতায় আনা হয়েছে। হামলা পরিচালনার জন্য তারা একাধিক পদ্ধতির পরিকল্পনা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।
এমতাবস্থায়, বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এ ছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হলো।
চিঠিতে ‘হামলা পরিকল্পনাকারী ব্যক্তিদের নাম এবং পরিচয়’ হিসেবে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন, মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ এবং অন্যজন মো. রাকিব হাসান। এদের উভয়ের বিভিন্ন ছদ্মনাম রয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে দ্য ডিসেন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে মাহেদ সেনা সদস্য; যার বাড়ি সিলেটে। রাকিব সেনা সদস্য নন। তার বাড়ি ঢাকার ধামরাই এলাকায়।
এদের মধ্যে মাহেদ কোথায় আছেন বা তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছ কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। তাকে ঢাকার নিকটবর্তী একটি থানায় রাখা হয়েছে।
গোপনীয় চিঠিতে দুই সেনাসদস্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একজন মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ। কিন্তু অন্যজনের নাম চিঠিতে নেই।
মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলে যা পাওয়া গেছে
গোপনীয় চিঠিতে সেনা সদস্য মাহেদ এবং সিভিলিয়ান রাকিবের ফেসবুক প্রোফাইলের লিংক যুক্ত করা হয়েছে। তাদের উভয়ের প্রোফাইল দুটি বর্তমানে ডিএক্টিভ রয়েছে। তবে মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে বিভিন্ন সময়ের বেশ কিছু পোস্টের স্ক্রিনশট সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
এসব পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাবেক এই সেনা সদস্য নিয়মিত উগ্রপন্থি বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট শেয়ার দিতেন। সিলেট কেন্দ্রিক অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করার পাশাপাশি নিয়মিত উগ্রপন্থি লেখালেখি করতেন। এমনকি ভিন্ন চিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে পোস্ট দিতেন তিনি। আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ছবিও পোস্ট করতেন তিনি।
২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ফেসবুকে লেখেন, সেনাবাহিনী দলগত মুরতাদ। প্রথমত এর কারণে বারাত। দ্বিতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা জালেম। তৃতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা আওয়ামী দোসর।

সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ এক পোস্টে তিনি লেখেন, আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। সুতরাং যে জমিনে আল্লাহর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাফরমানি করতে হয়, শিরক করতে হয়, তাগুতের কাছে বিচার চাইতে হয়, সে জমিন হয় ফিতনামুক্ত করার চেষ্টা করো তলোয়ার দ্বারা, অথবা সে জমিন ত্যাগ করো।
৫ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে তিনি লেখেন, মাজার পূজারি, মিলাদুন্নবি পালনকারীরা মুশরিক, বেদাতি। এদেরকে হত্যা করা বৈধ, রক্ত সর্বাবস্থায় হালাল। সুতরাং, হে মুমিনরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখে এক পোস্টে তিনি বলেন, তারা জঙ্গি বলে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলতে চায়। জানিয়ে দাও, এটাই আমাদের পরিচয়। আমি কে, তুমি কে—জঙ্গি, জঙ্গি।
২০২৫ এর ১৫ আগস্ট মাহেদের একটি পোস্ট ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সেটিতে লিখেছিলেন, ১৫ আগস্ট সারা দিন...বঙ্গবনল্ডুকে তাকফির করার দিন...। পুরো শেখ পরিবার কাফের শুধু নাবালক বাচ্চারা ছাড়া, শেখের অনুসারীরা কাফের, তার দলের নেতারা কাফের, কর্মীরা কাফের। তাদেরকে মুসলমান মনে করা শায়েখরাও কাফের।

দ্বিতীয় যে সেনা সদস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে (নাম উল্লেখ করা হয়নি) চিঠিতে তার পরিচয় জানাতে পারেনি কোনো সূত্র।
তবে চিঠিতে উল্লেখিত সিভিলিয়ান রাকিব হাসান ছদ্মনামে একাধিক ফেসবুক আইডি পরিচালনা করেন। তার মূল আইডিটি ডিএক্টিভ থাকলেও অন্য আরও দুটি আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি জঙ্গি সংগঠন আইএস এর সমর্থনে বিভিন্ন কন্টেন্ট শেয়ার করতেন। শেষে ‘উসামা’ নামের একটি আইডি থেকে ইরাকে আইএস জঙ্গিদের পতাকা বহনের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে, ‘দুটি পথ আছে: হয় বিজয়, যা আমরা অর্জন করি, অথবা জান্নাত, যেখানে রয়েছে সবচেয়ে মনোরম আবাস। আমরা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করি না, হাজার হাজার বীর জড়ো করেও নয়। আমরা সেই বিশ্বাস নিয়ে যুদ্ধ করি, যার পতাকা আমাদের প্রাথমিক দিনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত করেছিল। দারুল ইসলাম।’