Image description

দিনে অন্তত ডজন দুয়েক অভিযোগ জমা। শুধুই জমা হচ্ছে। জমে স্তূপ। কিন্তু ফাইল খুলে সিদ্ধান্ত দেয়ার কেউ নেই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এই অচল অবস্থার দুই মাস হতে চলছে। কমিশন শূন্য দুদক। চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার ছাড়া কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলার সিদ্ধান্ত, তদন্তের অনুমোদন কিছুই করার এখতিয়ার নেই সংস্থাটির আইনে। এদিকে, প্রায় দুই মাসে অন্তত হাজার খানেক অভিযোগ জমা হয়েছে দুদকে। আর অনুসন্ধান শেষে মামলার অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় শতাধিক ফাইল।

একইভাবে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পত্তি ক্রোক কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও কমিশন না থাকায় অনুমোদন মিলছে না। এসব কারণে কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে রাষ্ট্রের সংবিধিবদ্ধ দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থাটি। 

বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৩রা মার্চ পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিশন। তখন থেকেই দুদকের অন্যতম কার্যক্রম অনুসন্ধান গ্রহণ, মামলা দায়ের ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা যাচ্ছে না। যে কারণে দুদকের এসব গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দিনের পর দিন জমা হলেও কমিশন পর্যায়ে আটকে আছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, এখন যেসব কর্মকর্তার কাছে কমিশন পদত্যাগের আগের গৃহীত অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম রয়েছে কেবল সেগুলোই এগিয়ে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক ও মহাপরিচালক বরাবর দাখিল করা হয়। কিন্তু সেসব ফাইল মহাপরিচালক থেকে কমিশনে উঠছে না, তৈরি হচ্ছে দুর্নীতির ফাইলের জট। এতে করে শত শত ফাইল জমে গেছে, নতুন কমিশন নিয়োগ পেয়ে যোগদান করার পর সেসব ফাইলের জট খুলতে পারে বলে আশার কথা বলছেন তারা।

কমিশন নিয়োগ দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা না গেলে দুর্নীতি সংক্রান্ত ফাইলের জট আরও বড় হওয়ার শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন দুদকের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম (জনসংযোগ) জানান, কমিশন না থাকায় নতুন করে কোনো অনুসন্ধান শুরু হওয়ার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র অনুমোদন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। দুদক নতুন কমিশনের অপেক্ষায় রয়েছে। কমিশন নিয়োগ হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হবে। দুদক আবার আগের গতিতে ফিরে যাবে।

যদিও দুদকে কমিশন নিয়োগ দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হয়। আইন অনুযায়ী সরকার কমিশন নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করবে। সেই সার্চ কমিটি তিনজন কমিশনার নিয়োগের জন্য ছয়জনের একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবেন। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা থেকে একজনকে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের কমিশন পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়। যেহেতু এখনো সার্চ কমিটিই গঠিত হয়নি, সে কারণে সহসাই কমিশন পাচ্ছে না দুদক।

দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপরই দুদকের সার্বিক কার্যক্রম নির্ভরশীল। কমিশন না থাকায় নতুন করে অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের কিংবা চার্জশিট দাখিল- কোনোটিই হচ্ছে না। এতে এক ধরনের অচলাবস্থা তো তৈরি হয়েছে। কমিশন নিয়োগ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, সেই সংকট আরও প্রকট হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ তৈরি করে। এসবের মধ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। যে কারণে আগের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিশন নিয়োগ দেয়া হবে।
গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২৯শে অক্টোবর পদত্যাগ করে মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন কমিশন।

এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ই ডিসেম্বর ড. আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই কমিশনে অপর দুই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও এ কমিশন মেয়াদের মাত্র এক বছর দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর গত ৩রা মার্চ পদত্যাগ করে।