Image description

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, টাকা ছাপিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গা থেকে আমরা সরবো না।

তিনি বলেন, এই ধরনের নীতিতে একদিকে সুদের হার বেড়ে যায়, অন্যদিকে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউড আউট’ হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবেই টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়।

শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিউজ কাভার করা সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার এমন একটি নীতিগত কাঠামো অনুসরণ করতে চায়, যেখানে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হবে না এবং উদ্যোক্তাদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা হবে না। এটা আমাদের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান গাইডলাইন ও প্রিন্সিপাল।

তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতা নির্ভর রাজনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’-এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থনীতির সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়ন জোরদার করা হচ্ছে। তার মতে, পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নারীর দক্ষতা সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে প্রাথমিক সেবা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় বেশি হলে মানুষের জীবনমান কমে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে কার্যত মানুষের আয় বাড়ে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাত সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। পাশাপাশি স্টার্টআপ, গ্রামীণ কুটিরশিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল খাতকে মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ পণ্যে নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণ সহায়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও সংগীতকে নতুন অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ এসব ক্ষেত্রও জাতীয় আয়ে অবদান রাখতে সক্ষম।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত কর্মদক্ষতা দেখাতে পারছে না।

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিষয়টিকে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না থাকলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো সম্ভব নয়। তবুও সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে, যাতে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পায়।

জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ টেকসই সমাধান নয়। বাজারকে চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হতে দিতে হবে। এজন্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় অতিরিক্ত জটিলতা থাকলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না।