Image description

তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প-কারখানায় উৎপাদন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কারখানাসহ অন্যান্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের দিকে যাচ্ছে। অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকের চেয়েও কমে নেমে এসেছে। গাজীপুরে প্রতিদিন গড়ে সাত ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এতে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সাভার ও এর আশপাশে শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং এবং তীব্র জ্বালানি সংকটে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সাভার পৌরসভা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে দিনে-রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক, চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক কারখানায় জেনারেটর ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও ডিজেলের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত মূল্যের কারণে মালিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সব সময় ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন লক্ষমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বায়ারদের সময় মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছেন না। সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিংয়ে শিল্প-কলকারখানা বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মাসখানেক পরেই আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা। যদি পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণ সম্ভব না হয় তাহলে গার্মেন্টস ফেক্টরিসহ রফতানিমুখী বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেয়া সম্ভব হবে নাÑ এমনটিই শিল্প-কলকারখানার মালিকরা বলছেন।

নারায়ণগঞ্জের তৈরী পোশাক কারখানার ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে তেল-গ্যাসের সংকটে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন চালু রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেয়া যাচ্ছে না। সামনে ঈদ। কীভাবে যে ব্যয় সামাল দেবোÑ তা নিয়ে বড় চিন্তায় আছি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইনকিলাবকে বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘœ ঘটায় দেশে ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা হুমকিতে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিতে পদক্ষেপ জরুরি।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের পোশাক খাত। প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এ সময়ে জেনারেটর চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ও পণ্য শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার আবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে।

পোশাক খাতের মতো টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্ট শিল্পও এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। লোডশেডিংয়ের সঠিক তথ্য দিচ্ছে না বিদুৎ বিভাগ। দেশে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র আটটি। এ ছাড়া উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি কেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র দুটি। এবার গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বর্তমানে গড়ে চাহিদা ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদার বিপরীতে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি-পিজিসিবি প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা, উৎপাদন, সরবরাহ চিত্র তুলে ধরে। সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, গত সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৯১২ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুসারে, সোমবার রাত ৯টায় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট। কিন্তু বিতরণ কোম্পানির তথ্য বলেছে ভিন্ন কথা। দেশের সবচেয়ে বেশি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় সংস্থাটি চাহিদার চেয়ে দুই হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পেয়েছিল। এর বাইরে আরো ছয়টি বিতরণ সংস্থা রয়েছে। তবে ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি ডেসকো এবং ডিপিডিসিকে চাহিদা অনুসারে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়, যাতে লোডশেডিং কম হয়।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। তবে আমরা আশা করছি, লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের তথ্যে গরমিল বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা মোক্তার হোসেন মোল্লা জানান, তীব্র লোডশেডিংয়ে অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়েছে ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়েছে কয়েকগুণ। দিনে ও রাতে সমান তালে হচ্ছে সীমাহীন লোডশেডিং। এতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানও তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না। ফলে শিল্পোৎপাদন অনেকটাই হ্রাস পাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে জালানি সংকট। জালানি সংকটের ফলে তেল চালিত গাড়িগুলো প্রয়োজনীয় তেলের অভাবে চলতে পারছে না ফলে সময় মতো পণ্য সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।

ফতুল্লার মুদি দোকানি আব্বাস আলী বলেন, এত লোডশেডিং আগে কখনো দেখিনি। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে দোকানে ক্রেতা কমে গেছে। মানুষ এত গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ের জন্য চরম কষ্টে আছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারায়ণগঞ্জের শিল্প উৎপাদনে। বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক পোশাক শিল্প কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

জেলার ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল, মেঘনা শিল্পাঞ্চল, রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চলসহ প্রায় আটটি শিল্পঞ্চলে উৎপাদনে সংকট দেখা দিয়েছে। এদিকে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে জেলার সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পে। সিমেন্টের প্রতি ব্যাগের দাম ইতোমধ্যে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একাধিক শিল্প মালিক জানান, তীব্র লোডশেডিং, জালানি সংকট ও জালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এর ফলে সঠিক সময়ে পণ্য শিপমেন্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ঠিকমতো শ্রমিকদের বেতন দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

গাজীপুর সংবাদদাতা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, গাজীপুরে এক দিকে প্রচ- গরম অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি শিল্প কারখানাগুলোতে লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একাধিক অভিভাবক জানান, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে এবং এই প্রচ- গরমে রাতে তারা ঘুমাতে পারছে না। গাজীপুর জেলা একটি শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। এই জেলার টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, গাজীপুর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় প্রায় পাঁচ হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুতের লোডশেডিং যেভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনে চরম ধস নামবে এবং আগামী ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমনকি শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। তাই শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং দেশের উন্নয়নে জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধানে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন শিল্প-কারখানার মালিকরা।

সভার সংবাদদাতা সেলিম আহমেদ জানান, সাভার ও এর আশপাশে শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং এবং তীব্র জ্বালানি সংকটে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক, চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাভার পৌরসভা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোতে দিনে-রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। সাভার পৌর এলাকার বাসিন্দা হামিদ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যায়। রাতে ঘুমানো যায় না, দিনে কাজ করা যায় না। আমরা এক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে আছি।

পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানাচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় এই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তারা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছেন না। তবে জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির-৩ এর উপ-মহাব্যবস্থাপক সোলায়মান হোসেন বলেন, আমাদের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর অধীনে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। আমাদের এখানে প্রয়োজন ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১৮৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ না থাকলে আপনারা যেমন গরমে রাতে ঘুমাতে পারেন না, তেমনি গ্রাহকদের চাপে রাতে আমাদেরও ঘুম হয় না। তবে কবে নাগাদ বিদ্যুতের এই সংকট দূর হবে তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারননি।

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাভার ও আশুলিয়ার শিল্প কারখানাগুলো এখন দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

নিডেল স্টিচ কম্পোজিট লিমিটেডের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ দুই ঘণ্টা পরপর ৪০ মিনিট ৫০ মিনিটের জন্য আসে। আবার কখনো পাঁচ মিনিট থাকার পর আবার দুই ঘণ্টার জন্য লোডশেডিং হয়। এটি আমাদের কারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের কারণে প্রায়ই কারখানা ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের (ডিজেল) কারণে জেনারেটর ও ঠিকমতো চালাতে পারছি না। আমাদের ছোট কারখানা তাই পামগুলো থেকে ঠিকমতো ডিজেল দিচ্ছে না। বড় বড় কারখানাগুলো পম্পের সাথে চুক্তি করে সব ডিজেল নিয়ে যায়। বিদ্যুত ও জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

একাধিক চামড়া ও তৈরী পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুতের অভাবে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশি বায়ারদের পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সব সময় ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাভারের একমাত্র ট্যানারি শিল্পনগরীতে চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। চামড়ার গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে। যা চামড়া শিল্পে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, রোজার ঈদের পর আমাদের যেসব চামড়া ট্যানারিতে এসেছে, সে সবও আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। এক ঘণ্টা থাকলে আবার এক-দেড় ঘণ্টা নেই।

বিদ্যুৎ সংকটে সাভারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফ্রিজে রাখা পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হচ্ছে এবং ইলেকট্রনিক-নির্ভর ব্যবসাগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। ছোট ও মাঝারি কারখানার মালিকরা জানিয়েছে, যদি দ্রুত এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে অনেক কারখানা লে-অফ ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। এতে করে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে, যেসব কারখানায় নিজস্ব সোলার পাওয়ার সিস্টেম রয়েছে, তারা এই সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারছে। অন্যদিকে ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ডিইপিজেড) মধ্যে যেসব পোশাক কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তুলনামূলকভাবে কম বলে জানা গেছে।

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা মো. খলিল শিকদার জানান, একদিকে জ্বালানি তেলের সংকট অন্যদিকে প্রচ- গরম ও বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় দুই হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। বেশ কিছু দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এসব কারখানার উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। শিল্প-কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, রূপগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। আর বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে জ্বালানি তেলের ভয়াবহ সংকটের কারণে জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে শতভাগ উৎপাদন করতে পারছেন না। তারা বলছেন, এভাবে জ্বালানি তেল সংকট ও লোডশেডিং চলতে থাকলে শিল্প-কারখানাগুলো সচল রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া উৎপাদন কমে আসলে শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর, যাত্রামুড়া, বরাব, বরপা, ভুলতা, আড়িয়াবো, কর্ণগোপ, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, হাটাবো, সাওঘাট, কাতরারচক, ডহরগাঁও, পাড়াগাঁও, মুড়াপাড়া, বানিয়াদিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রায় দুই হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে প্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি, থ্রি-পিস, চাদর, প্রিন্ট কাপড়, লুঙ্গি, প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যসহ হরেক রকমের জিনিসপত্র। রয়েছে নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানাও। এর মধ্যে হারবেস্ট রিচ গার্মেন্টস, অলটেক্স, অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানা, গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানা, ফকির ফ্যাশন, সিটি অয়েল মিল, রবিন টেক্স অ্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডের মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল সংকটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখতে পারছে না। এছাড়া জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি এলাকায় মাঝে মাঝে গ্যাসেরও সংকট রয়েছে। তাছাড়া এভাবে সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

গোলাকান্দাইল এলাকার জুনায়েত ফ্যাশন গার্মেন্টসের মালিক ইমরান হোসেন বলেন, আমার কারখানায় টি-শার্ট তৈরি হয়। কারখানাটি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দিনে অন্তত ১৫ থেকে ২০ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। কারখানায় নিয়োজিত প্রায় ৩০০ শ্রমিক বিদ্যুৎ না থাকলে বসে সময় কাটান। ভুলতা এলাকার ভাই ভাই অ্যামব্রয়ডারি কারখানার মালিক আলিনুর ব্যাপারী বলেন, একদিকে প্রচ- গরম অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং। আমরা আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। কাঞ্চন এলাকার রুপা টেক্সটাইল মিলসের মালিক মো. খলিল জানান, স্থানীয় তাঁতীদের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁতীরা আমাদের টেক্সটাইল মিলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সারা বছরই মিলটি চালিয়ে রাখতে হয়। শীতের সিজনে টেক্সটাইলে তৈরি চাদর বিক্রি করে থাকি। এবার যে হারে সুতার দাম বেড়েছে তার ওপর আবার জ্বালানি তেল সংকট ও বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং। উৎপাদন করতে গিয়ে এখন খরচ অনেক বেড়েছে।