মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আকাশপথের যাত্রায়। দফায় দফায় বেড়েছে জেট ফুয়েলের দাম। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজের ভাড়াও বেড়ে গেছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার কিংবা সৈয়দপুর-সব রুটেই টিকিটের ন্যূনতম দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। আগে ঢাকা-সৈয়দপুর বা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত। সেখানে বর্তমানে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তের টিকিটের ক্ষেত্রে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটে প্রতি টিকিটের দাম ৭০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আকাশপথে যাতায়াত ক্রমেই কমে যাবে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এভিয়েশন খাত। সংকটে পড়বে দেশের বিমান ব্যবস্থাপনা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজি ওয়াহিদুল আলম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেট ফুয়েলের দামে। জ্বালানি খরচ বাড়লে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে তারা ভাড়া সমন্বয় করতে বাধ্য হয়। তবে এভাবে টিকিটের দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ যাত্রীরা আকাশপথ এড়িয়ে সড়ক বা রেলপথে ঝুঁকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এভিয়েশন খাতের জন্য ক্ষতিকর হবে।
জেট ফুয়েলের দাম এক মাসে বাড়ল তিনবার : প্রাপ্ত তথ্যমতে, উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম সর্বশেষ ৩০ দিনের ব্যবধানে তিনবার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সর্বশেষ গত ৭ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ০৮ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার (শুল্ক ও মূসকমুক্ত) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ মার্চ জেট ফুয়েলের দাম এক লাফে অভ্যন্তরীণ রুটে ৮০ শতাংশ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৯ শতাংশ বাড়ানো হয়। সে সময় বিইআরসি অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। তাতে লিটারপ্রতি দাম বেড়ে যায় ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা। সেদিন আন্তর্জাতিক রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ০ দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ লিটারে বাড়ে ৭১ টাকার বেশি। তার আগে ৮ মার্চ বিইআরসি মার্চ মাসের জন্য অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম ৯৫ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। আন্তর্জাতিক রুটে তখন ০ দশমিক ৬২ ডলার থেকে বাড়িয়ে ০ দশমিক ৭৩৮৪ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম মার্চের শুরুতে নির্ধারিত দামের তুলনায় ৮০ শতাংশ বাড়ে। আন্তর্জাতিক রুটেও বৃদ্ধির হার কাছাকাছি ছিল। সে তুলনায় এপ্রিলে অভ্যন্তরীণ রুটে বাড়ল প্রায় ১২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক রুটেও প্রায় একই হারে বেড়েছে।
বাড়তি ভাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলে। মার্চের শেষদিকে এক দফা বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর দুই সপ্তাহ না যেতেই নতুন সমন্বয়ের মাধ্যমে আবারও বেড়েছে এয়ার টিকিটের দাম। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রথম দফায় জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার পরই অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়া বাড়ায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্স।
ভাড়া বেড়েছে অভ্যন্তরীণ রুটে : দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স-ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা তাদের বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়া বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও সৈয়দপুর রুটে একমুখী ভাড়া বেড়েছে কমপক্ষে ১,৪০০ টাকা। যশোর ও রাজশাহী রুটে এই বৃদ্ধি প্রায় ১,২০০ টাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স গড়ে অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিটি টিকিটের দাম গড়ে প্রায় ২,০০০ টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ১০,০০০ টাকারও বেশি বেড়েছে। এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ যাত্রীরা।
ঢাকা-যশোর রুটের নিয়মিত যাত্রী মৌসুমি আক্তার যুগান্তরকে বলেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে আমাকে মাসে দুই থেকে তিনবার যশোর থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি যেভাবে বিমানভাড়া বেড়েছে, তাতে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। এক মাস আগেও সাড়ে ৪ হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত। এখন সাড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই বাড়তি খরচ আমার মতো সাধারণ যাত্রীদের জন্য অনেকটাই চাপের। সরকারের উচিত জ্বালানির দাম সমন্বয় করে ভাড়া একটি সহনীয় ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জেট ফুয়েলের দাম আবারও বাড়ায় অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়া আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকার ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিক রুটে চলাচল করতে পারছে না। ইসরাইল, ইরানসহ কয়েকটি দেশের আকাশপথ এড়িয়ে চলার কারণে ফ্লাইটের দূরত্ব বেড়েছে। ফলে জ্বালানি খরচও বেড়েছে। তাই বেড়েছে টিকিটের দাম।
আন্তর্জাতিক রুটেরও অভিন্ন চিত্র : ঢাকা থেকে লন্ডন যাওয়ার টিকিট খুঁজছিলেন শিক্ষার্থী নাবিলা তাসনিদ। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে একই রুটে তাকে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি আসার সময় বাংলাদেশ বিমানের টিকিট কেটেছিলাম ১ লাখ ১০ হাজার টাকায়। এখন যাওয়ার সময় দেখছি সেই টিকিটের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
শুধু যাত্রী নয়, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য পুরো এভিয়েশন শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাত্রী ভাড়ার ওপর। টিকিটের দাম বাড়লে সাধারণ যাত্রীরা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক-উভয় রুটেই যাত্রীসংখ্যা কমে যেতে পারে। তাই জ্বালানির দাম বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এভিয়েশন খাত টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নীতি প্রণয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ তোয়াহা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে ইউরোপগামী ফ্লাইটের সংখ্যা কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় সব এয়ারলাইন্সই টিকিটের দাম বাড়িয়েছে। তিনি জানান, যাত্রী চাহিদা বেশি থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিট সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেক ক্ষেত্রে ২০ দিন পরের টিকিট পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটে টিকিটের মূল্য গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওবি) সাবেক উপদেষ্টা এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা এখন ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে, যেখানে যাত্রীসংখ্যা ইতোমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু আঞ্চলিক সংযোগই নয়, দেশের পর্যটন শিল্পও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। a