Image description
‘রেল চলছে আল্লাহর ওয়াস্তে’

রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৫৩ কিলোমিটার। রেলপথ ঘণ্টায় ১২০-১৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলার উপযোগী (প্রকল্প বাস্তবায়ন অনুসারে)। বর্তমানে এ রুটে যেসব লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ চালানো হচ্ছে (কেনার শর্ত অনুসারে) সেগুলোর সক্ষমতা ১২০-১৪০কিলোমিটার/ঘণ্টা। পুরো পথই ডাবল লাইনের, নেই ক্রসিংয়ের ঝামেলাও। সে হিসাবে মাত্র দুই ঘণ্টায় পৌঁছানোর কথা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে। একশ কিলোমিটার গতিতে চললেও পৌঁছানোর কথা আড়াই ঘণ্টায়। কিন্তু এই পথে সময় লাগছে সাত ঘণ্টা! প্রায় তিনগুণ।

ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো ডাবল লাইন না থাকলেও ঢাকা-যশোর রুটে ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ পুরোটাই নতুন। পদ্মা রেললিংক প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা এ রেলপথও ১৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলার উপযোগী। ইঞ্জিন-কোচও নতুন, ১৪০ কিলোমিটার/ঘণ্টার। সে হিসাবে এ রুটে সময় লাগার কথা মাত্র দেড় ঘণ্টা। কিন্তু লাগছে সাত ঘণ্টার বেশি। একইভাবে ঢাকা-খুলনা ২১২ কিলোমিটার পথ দুই ঘণ্টায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও লাগছে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা। ঢাকা-পঞ্চগড় ৫০৯ কিলোমিটার পথ আন্তঃনগর বিরতিহীন ট্রেনও পাড়ি দেয় ১৩ ঘণ্টায়। কখনো তারও বেশি। যেখানে লাগার কথা মোটে চার ঘণ্টা। ঢাকা-রাজশাহী দূরত্ব ২৪৩ কিলোমিটার, সময় লাগছে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত।

দেশের বেশির ভাগ রেলরুটের চিত্র একই। রেলপথ, ইঞ্জিন ও কোচ-বিচারে যাত্রাপথে যে গতিতে ট্রেন চলার কথা তার দুই থেকে তিনগুণ বেশি সময় নিচ্ছে। ট্রেন চলার যে টাইম-টেবিল তৈরি, সেখানেই দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সময়। এরপরও যথাসময়ে পৌঁছতে পারছে না ট্রেন। ফলে যে সময়ে ও খরচে তিনবার কোনো রুটে যাতায়াত করা যেত বা অন্তত দুবার-সেখানে বর্তমানে যাতায়াত করা যায় একবার। এতে একদিকে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে যাত্রী, অন্যদিকে লোকসান দিচ্ছে রেল। ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান গুনেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। এত ধীরে ট্রেন চালানোর পরও যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় শুধু গত ঈদযাত্রায় ২৩ দুর্ঘটনায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিগত ১৬ বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৯০। আহত ২ হাজারের বেশি।

উন্নয়নে এত খরচের পরও কেন রেলের এ দশা? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ যথাযথভাবে খরচ করা হয়নি। কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন-দেখা হয়নি সেটিও। ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে ত্রুটি। সংকেতব্যবস্থা আধুনিক হলেও এর ব্যবহার অনেকটাই এনালগের মতো। ‘কন্ট্রোল’ বলে যা রয়েছে-সেটি সেকেলে ও অদক্ষ কর্মী পরিচালিত। আর রেলপথ ও ইঞ্জিন-কোচ পরিচর্যায় যতটুকু গুরুত্ব দেওয়ার কথা, তার এক-চতুর্থাংশও পরিপালন করা হয় না। অর্থাৎ মেইনটেন্যান্সের বালাই নেই বললেই চলে।

রেলওয়ে অপারেশন দপ্তর জানায়, বর্ণিত রুটে ট্রেন চলছে গড়ে ৬০ কিলোমিটার গতি নিয়ে। কোনো কোনো রুটে গতি এর অর্ধেকপ্রায়। এতে জ্বালানি খরচসহ লোকবল লাগছে বেশি। কাঙ্ক্ষিত সময়ে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো (১১৪টি আন্তঃনগর ট্রেন) চললে একই জ্বালানি ও লোকবল দিয়ে বর্তমানের তিনগুণ ট্রিপ দেওয়া সম্ভব ছিল। বর্তমানে যাত্রী পরিবহণে বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আয় হয়। ট্রিপ বাড়িয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব।

সূত্রমতে, প্রতিবেশী ভারতে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চলছে। সেখানে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ তৈরিতে খরচ ৪৫ থেকে ৯০ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশে ২২৬ কোটি টাকা পর্যন্ত। ঢাকা-যশোর ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এ দুই রুটে তিন বছরে হাতেগোনা ৫-৬টি ট্রেন চলছে। ঢাকা-যশোর রুটে বছরে আয় ৫৫ কোটি টাকার কম। অথচ প্রকল্পের প্রাক্কলনে ২০২৫-এ আয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বছরে আয় ২০০ কোটি টাকারও কম। কিন্তু বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা।

সূত্রমতে, অল্প কোচ নিয়ে ট্রেন পরিচালনার সমস্যা থেকেও রেহাই মেলেনি। একই খরচে ১৮ থেকে ৩৩ কোচের ট্রেন যেখানে চালানো যায়, সেখানে থাকছে ৭ থেকে ১৪টি। অথচ প্রতিবছর যাত্রী বাড়ছে। ফলে দুই অঞ্চল মিলিয়ে সারা দিনে ২৮৪টি যাত্রীবাহী ট্রেন চালিয়েও ভিড় সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ৭৬ শতাংশ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালাতে গিয়ে প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ৮৪টি ট্রেন বন্ধ রয়েছে।

পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘উচিত কথা বললে চাকরি থাকবে না। ওপরের (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) কর্তারা নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না। উলটো নিয়মিতই দুই অঞ্চল থেকে সদর দপ্তরে (রেল ভবনে) রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, প্রায় ১০০ শতাংশ ট্রেন সময়মতো চলছে। অথচ এই সময়সূচিতেও বড় ফাঁকি রয়েছে। এর ওপর ক্রসিংয়ের মারপ্যাঁচে কোনো কোনো ট্রেনকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপারেশন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, রেল মূলত চলছে আল্লাহর ওয়াস্তে। রেলপথের জরাজীর্ণ অবস্থা কেউ আমলে নেয় না। সবাই প্রকল্পের পেছনে ছুটছে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ভিড়ে রেলপথ সংস্কারের বরাদ্দই মেলে না। উন্নত (?) ইঞ্জিন-কোচও গড়ে ৬০ কিলোমিটারের ওপরে ওঠে না। সিলেট লাইনে কিছু সেকশনে ৫-১৫ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) প্রকৌশলী ফকির মোহাম্মদ মহিউদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, গত ১৬ বছরে যে অপরিকল্পিত উন্নয়ন করা হয়েছে-এর সুফল রেল তথা সাধারণ যাত্রী পাচ্ছে না। অথচ ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে। রেলপথ নির্মাণ করা হলেও রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ) কেনা হয়নি। এখন রেলপথ আছে, নতুন ট্রেন নেই। দ্রুত ৩০০ কোচ এবং ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে। এতে নতুন রেলপথে অন্তত ১৫টি ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, লুটপাটের উন্নয়নের ফল এমনই হয়। মূলত দুর্নীতি আর লুটপাট করা হয়েছে। বহু প্রকল্প যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সমাপ্ত দুই প্রকল্পে কী করে ৫-৬টি ট্রেন চলে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ট্রেনে সর্বোচ্চ গতি ওঠাতে হলে যথাযথ রেলপথ প্রয়োজন। পশ্চিমাঞ্চল রেলে ২০ শতাংশের বেশি রেলপথ অতিরিক্ত ক্ষয় হয়ে পড়েছে। এটি দিয়ে ঝুঁকিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এসব লাইন পরিবর্তনের জন্য কয়েকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া অবৈধ ও গেটম্যানবিহীন লেভেলক্রসিংগুলোও ট্রেন পরিচালনায় গলার কাঁটা। যাত্রী সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী সুবক্তগীন যুগান্তরকে বলেন, সর্বোচ্চ গতি নিয়ে কোনো ট্রেনই চালানো সম্ভব হচ্ছে না। জরাজীর্ণ রেলপথ মেরামত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাওয়া লাইন পরিবর্তনে কাজ চলমান রয়েছে। আয় ও সেবা বাড়াতে ট্রেনের গতি ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।