দেশে তীব্র সংকটের মধ্যেও সীমান্ত দিয়ে পাচার হচ্ছে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে কক্সবাজারের চোরাকারবারিরা পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে কৌশলে সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করছে। এ ছাড়া রাতের আঁধারে মেহেরপুর সীমান্তে তেল পাচারে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। এদিকে, পাচারের শঙ্কায় রাজশাহী সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। এসবের বাইরে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৩০০ লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। অবশ্য, বেশি দামের কারণে সিলেটে পাচারের শঙ্কা নেই। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য।
কক্সবাজার : জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্য পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে কৌশলে সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকার পরও মিয়ানমারে জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই এসব পণ্যের কিছু অংশ জব্দ করা হলেও থেমে নেই পাচার। মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মিয়ানমারে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বেড়ে গেছে দামও। সেখানে পেট্রোল-অকটেনের লিটার ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। তাই পাচারকারীরা নিয়েছেন নতুন কৌশল। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে এখন সমুদ্র উপকূলকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে তারা। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে উপকূলের ট্রলার ও জেলেদের নৌকা।
জানা গেছে, পাচারের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে টেকনাফের শামলাপুর, বাহারছড়া ও শাহপরীর দ্বীপ, পৌরসভার জালিয়াপাড়া, চৌধুরীপাড়া ও উখিয়ার রেজুখাল, ইনানি, হিমছড়ি ও নাজিরারটেক পয়েন্ট। এসব স্থান দিয়ে জ্বালানি তেল পাচাররোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, ইউরিয়া সার, জ্বালানি তেল ও ওষুধ। পাচারের তালিকায় সম্প্রদি যুক্ত হয়েছে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ এসিড ও বারুদ। পণ্য পাচারে পাচারকারীরা নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সীমান্ত পথে নৌপথ ব্যবহার করছে। মিয়ানমারে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশটির অন্যান্য এলাকা থেকে পণ্যসামগ্রীও রাখাইনে পাঠানো বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে আরাকান আর্মি-শাসিত রাখাইনে বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট চলছে। লোকজনের বেশির ভাগ চাহিদা মেটানো হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য দিয়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চোরাচালান কার্যক্রমটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম স্তরে রয়েছে কয়েকজন সশস্ত্র রোহিঙ্গা সদস্য, যারা রাখাইন রাজ্য থেকে চাহিদা বা অর্ডার সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল। যার মধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে ছয়-সাতজনের একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যারা পণ্য সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। মিয়ানমারে পাচারকালে গত এক বছরে কোস্টগার্ড ১৪ হাজার ৮৮১ লিটার ডিজেল ও ৩১ হাজার ২৭০ লিটার অকটেন জব্ধ করেছে। সেই সঙ্গে বেশ কয়েকজন পাচারকারীকেও আটক করা হয়েছে। বিজিবি রামুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের এ সংকটকালে কোনো অবস্থাতেই যাতে তা পাচার না হয় সেজন্য বিজিবি কাজ করছে এবং পাচার রোধে কড়া নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মেহেরপুর : মহেরপুরের সীমান্তঘেঁষা জনপদে অন্ধকার নামলেই বদলে যায় চিত্র। গভীর রাতে মাঠের আইল, খালের পাড় এবং কাঁটাতারের ফাঁক গলে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে ব্যারেলভর্তি জ্বালানি তেল- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। সম্প্রতি মেহেরপুর সদর উপজেলার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েক হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২৬টি ব্যারেলে সংরক্ষিত এসব তেলের কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এগুলো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল। বুড়িপোতা সীমান্তের আবদুস সালাম বলেন, সন্ধ্যার পর থেকেই এলাকায় অচেনা লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। গভীর রাতে শুরু হয় মূল তৎপরতা। বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট চালানে তেল এনে নির্জন বাড়ি বা খামারে রাখা হয়। পরে রাত ২টার পর ভ্যান বা মোটরসাইকেলের মাধ্যমে সীমান্তের দিকে নেওয়া হয়ে থাকে। এরপর গোপন পথ বা কাঁটাতারের দুর্বল অংশ ব্যবহার করে পাচার করা হয়। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাতে হঠাৎ দু-তিনটা মোটরসাইকেল এসে থামে, আবার দ্রুত চলে যায়। কী নিয়ে আসে, সেটা সবাই বোঝে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না।’
একজন তেল ব্যবসায়ী জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের জ্বালানি তেলের দামের পার্থক্যই পাচারের মূল কারণ। কম দামে সংগ্রহ করে সীমান্তের ওপারে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ থাকায় এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা বিস্তার লাভ করছে। পাশাপাশি খোলা মাঠ, গ্রামঘেঁষা সীমান্ত এবং খালপথ পাচারকারীদের জন্য সহজ পথ তৈরি করেছে। মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের দাবি- তেল পাচার ঠেকাতে জেলা প্রশাসন সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
রাজশাহী : ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মূল্যের খুব একটা ফারাক নেই। দাম বাড়ানোর পর রাজশাহীর চেয়ে প্রতি লিটারে ২-৩ টাকা বেশি কলকাতায়। তার পরও পাচার ঝুঁকি এড়াতে সীমান্তে নিরাপত্তা টহল জোরদার করেছে বিজিবি। এমন পরিস্থিতিতে তেল পাচার ও দেশের অভ্যন্তরে মজুত ঠেকাতে রাজশাহীর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপোতে ২৫ মার্চ থেকে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি রাজশাহীর ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেয়, ফলে দেশের বাজারে এর দাম পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় কিছুটা কম। এ মূল্য ব্যবধানের কারণে পাচারের প্রবণতা তৈরি হয়। তবে এ ধরনের কার্যক্রম রোধে বিজিবি কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। রাজশাহীতে সীমান্তের আট কিলোমিটারের ভিতরে বিজিবি সরাসরি নজরদারি এবং এর বাইরে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও সাম্প্রতিক সমন্বয়ের পর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং কলকাতার বাজারদর প্রায় একই স্তরে পৌঁছেছে। রাজশাহীতে প্রতি লিটার পেট্রোল ১৩৫ টাকা। কলকাতায় ১৩৭ টাকা। ডিজেল ১১৫ টাকা, ভারতে কয়েক পয়সা কম। আবার অকটেনের দাম প্রায় একই। জেলায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার জানান, তিনটি ডিপো থেকে মোট ৬৪টি পেট্রোলপাম্পে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৮ কিলোমিটারের ভিতরে আছে ১২টি পাম্প। এসব স্থানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে।
রংপুর : রংপুর বিভাগের সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি তেল পাচার রোধে বিজিবির সতর্ক অবস্থান রয়েছে। জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতার সুযোগে পাচার ঠেকাতে সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে বিজিবি। এক মাসে রংপুর বিভাগের তিন জেলার সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৩০০ লিটারের বেশি জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে বিজিবি।
রংপুর বিজিবি সেক্টর কমান্ডার সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে সীমান্ত এলাকা থেকে ১ হাজার ৩১৮ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ১ হাজার ১৩৫ ও পেট্রোল ১৮০ লিটার। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এসব জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি জোরদার, চেক পোস্ট স্থাপন, বিশেষ টহল ও সন্দেহভাজন যানবাহনে তল্লাশি কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। রংপুর বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল শফিক জানিয়েছেন, জব্দ জ্বালানি ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেখানে পাচার হওয়ার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। সীমান্তবর্তী মানুষ পাচারের চেয়ে মজুত রাখতে বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়েছে। সীমান্তে বিজির কঠোর অবস্থানের কারণে পাচারকারীরা তেল পাচারের সাহস পাবে না।
সিলেট : সিলেট সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের কোনো শঙ্কা দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। এরপরও সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি রেখেছে বিজিবি। পাম্পগুলোতে মোটামুটি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সংকট আতঙ্কে চাহিদা কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। সিলেটের সীমান্তঘেঁষা ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের মধ্যে মেঘালয় দিয়েই বেশি চোরাচালান হয়ে থাকে। মেঘালয়ের সঙ্গে স্থল সীমান্ত হওয়ায় চোরাকারবারিরা এ সীমান্ত বেছে নেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে গড়ে প্রতি লিটার পেট্রোল ৯৬.৩৪ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। যা বাংলাদেশি টাকায় ১২৬.৫১ টাকা। আর বাংলাদেশে প্রতি লিটার পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। এ ছাড়া মেঘালয়ে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় মূল্য ৮৭.১২ রুপি বা ১১৪.৪১ টাকা। আর বাংলাদেশে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকা। বাংলাদেশ থেকে ভারতের মেঘালয়ে জ্বালানি তেলের মূল্য কম হওয়ায় পাচারের শঙ্কা দেখছেন না সিলেটের ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল : জ্বালানি তেল ভারতে পাচার রোধে যশোর ৪৯ বিজিবি বেনাপোল সীমান্তের ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় টহল জোরদার করেছে। এ ছাড়া, সীমান্ত এলাকার ২২টি তেল পাম্পে চোরাচালান প্রতিরোধ এবং তেল মজুতের বিরুদ্ধে নজরদারিতে রেখেছে।