Image description

অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) বন্ধ, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) গোপন করতে না পারা, মোবাইল ফোন অপারেটরদের একচ্ছত্র আধিপত্য কমানো, বাজারে অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত, রাজস্ব বৃদ্ধি, অবৈধ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ২০০৭ সালে ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জের (আইসিএক্স) লাইসেন্স দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে ভারসাম্য, অবৈধ কল টার্মিনেশন বন্ধ, সরকারের নায্য রাজস্ব আদায়, বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশিয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়বের ব্যক্তিগত বিশেষ আগ্রহে মধ্যস্থতাকারী নির্মূলের অজুহাত তুলে ২০২৫ সালের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতির মাধ্যমে আইসিএক্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে।

এরফলে এত বিপুল সংখ্যক অপারেটরের আন্তঃসংযোগ আরও জটিল, ব্যয়বহুল ও বৈষম্যমূলক হবে। বাংলাদেশের মতো সিন্ডিকেট-প্রবণ বাজারে এতে বড় মোবাইল অপারেটরদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, সেবার মান কমবে এবং গ্রাহক ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিদেশী অপারেটরনির্ভর বাজারে আইসিএক্সের মত দেশীয় ইন্টারকানেকশন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে টেলিযোগাযোগ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ডেটা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের স্বনির্ভর অবকাঠামো গঠনের লক্ষ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন নীতিমালার কারণে সেই ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব চলে যাবে বিদেশি মোবাইল ফোন অপারেটরদের হাতে। আবার এই খাত থেকে বিপুল পরিমান দেশিয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বন্ধের পাশাপাশি সরকার রাজস্ব হারাবে ৩০০ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দ্রুততার সঙ্গে প্রণীত ও পাশ হওয়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ২০২৫ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, নতুন খসড়া নীতিমালায় আইসিএক্স ব্যবস্থার ভূমিকা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি, যা দেশের টেলিকম ইকোসিস্টেম, রাজস্ব, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

২০০৮ সালের আগে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারকানেকশন, অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবহার এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) গোপন করার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায় এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বড় অপারেটররা ছোট অপারেটরদের জন্য কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত, যা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করত। এই প্রেক্ষাপটে, ২০০৭ সালের আইএলডিটিএস (ইন্টারনেট লং ডিসটেন্স টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিসেস) নীতিমালার মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও কেন্দ্রীয় ইন্টারকানেকশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আইসিএক্স (ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ) লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, রাজস্ব বৃদ্ধি, অবৈধ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন।

আইসিএক্সের মূল কাজ হলো ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েগুলোর (আইজিডব্লিউ) মাধ্যমে বিদেশ থেকে যেসব কল আসে, তা মোবাইল ও অন্যান্য টেলিফোন (এএনএস বা একসেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস) অপারেটরের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আইসিএক্সের মাধ্যমে কল সরকারের নজরদারিতে থাকে। এর ফলে গ্রে ট্রাফিক বা অবৈধ কলের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ সম্ভব হয়। তারচেয়েও বড় বিষয় হলো- আইসিএক্সের ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালায় আইসিএক্স প্রতিষ্ঠানগুলো বিলুপ্ত করে দিয়েছে। আর এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দেশে থাকা বিদেশি মোবাইল ফোন অপারেটরদের।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে আইসিএক্স সফলভাবে টেলিযোগাযোগ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মাধ্যমে: আন্তঃঅপারেটর কল ট্রাফিক একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হচ্ছে, সিডিআর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও ট্রাফিক ম্যানিপুলেশন বন্ধ হয়েছে, বছরে আনুমানিক ২৮০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব সরকার নিশ্চিত করতে পেরেছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে, হাজার হাজার প্রকৌশলী ও পেশাজীবীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রীয় ডেটা অ্যাক্সেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালায় আইসিএক্স ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত রেখে বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক। তারা মনে করেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নই পারে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।

অ্যাসোসিয়েশন অব আইসিএক্স অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এআইওবি) এর সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) আমিনুর রহমান বলেন, এই খাতে একটি অরাজক ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্যই আইসিএক্স তৈরি করা হয়। তখন প্রচুর পরিমাণে অবৈধ ভিওআইপি হতো, এক অপারেটর অন্য অপারেটরদের কল না দিয়ে তা ব্লক রাখা হতো এবং সরকার তো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাতো। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতেই আইসিএক্স তৈরি করা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই ব্যবস্থা বাতিল করে আবার পুরনো পদ্ধতি চালু করতে চায়। এর ফলে অপারেটররা আবার দায়িত্ব পাবে এবং সরকার তো রাজস্ব হারাবেই পাশাপাশি রাষ্ট্রের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বও অন্যদের হাতে চলে যাবে।

এআইওবি’র সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান (অব.) বলেন, নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালায় এই ব্যবস্থার অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে বা গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদি আইসিএক্স ব্যবস্থা দুর্বল বা বিলুপ্ত করা হয়, তাহলে অবৈধ ভিওআইপি ও কল ম্যানিপুলেশন বৃদ্ধি পেতে পারে, আন্তঃঅপারেটর সংযোগে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, বড় অপারেটরদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি বাড়বে, সরকারের রাজস্ব হ্রাস পাবে, কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পরিশেষে জাতীয় নিরাপত্তা দুর্বল হতে পারে।

তিনি বলেন, এই খাতে ইতোমধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে, যা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এছাড়া, ভবিষ্যৎ আইপি-ভিত্তিক ভয়েস ও এসএমএস সেবার জন্য করা সাম্প্রতিক বিনিয়োগ (প্রায় ১৩০ কোটি টাকা) অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।