৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনভাবে দেশের এবং জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। জনগণের অভিপ্রায়ের আলোকে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক করে, চুক্তি করে।
বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই একা চলতে পারে না। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ব এগিয়ে যায়। দেশ এগিয়ে যায় সামনের দিকে। তবে এই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে মর্যাদার, শ্রদ্ধার এবং দেশের স্বার্থে। এখন অবশ্য বিশ্বের অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ছাড় দিতে হয়। কিন্তু সবসময় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। একদম ছোট ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও বড় দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে গেলে দেশের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বহু দেশের সঙ্গে অনেক চুক্তি করেছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে করা এসব চুক্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই এমন কোনো চুক্তি করেনি যাতে দেশের স্বার্থ পুরোপুরি ক্ষুণ্ন হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যায় এমন চুক্তি বাংলাদেশ কোনো অগণতান্ত্রিক শাসনামলেও হয়নি। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, তা এক কথায় দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হওয়ার চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বই শুধু ক্ষুণ্ন হয়নি, আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও মৃত্যু ঘটেছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, শ্রম খাত এবং জাতীয় নিরাপত্তার কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।
এই চুক্তির ফলে মুসলিমপ্রধান এই দেশে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, বলোগনা/বলোগনে, ব্র্যাটউরস্ট, ক্যাপিকোলা/ক্যাপোকোলা, চরিজো, কিলবাসা, মরটাডেলা, প্যানসেটা, প্রসিউটো এবং সালামে/সালামির মতো নানা পদের শূকরের মাংস আমদানির অবাধ সুযোগ প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। এই চুক্তিকে ইতিমধ্যেই দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আনু মুহাম্মদসহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পুরো চুক্তিটি আরও ভয়াবহ। এই চুক্তি একটি দাসত্বের দলিল। চুক্তিপত্রে কেবল পণ্যের শুল্ক নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড শীর্ষক এই চুক্তিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এসেছে ৫৯ বার। অথচ বাংলাদেশের নাম এসেছে ২০৫ বার। মূলত বাংলাদেশকে কী করতে হবে, তার বিবরণ দেওয়া হয়েছে এই চুক্তিপত্রে। চুক্তির পরিশিষ্ট ২ তে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশগম?্য পণ্যের তালিকা আছে ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, চরিজো, কিলবাসার মতো শূকরের মাংস। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বা বৈধ উপায়ে শূকরের মাংস আমদানি করা যায় না, কারণ এটি আমদানি নীতি অনুযায়ী নিষিদ্ধ। অথচ এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য হারাম এই মাংস আমদানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা কেনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রতিযোগিতা মূল্যে বিশ্ব বাজার থেকে উড়োজাহাজ কেনার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কার্যত বিমান পুরোপুরি মার্কিন বোয়িং কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে গেছে এই চুক্তির আওতায়। এই চুক্তির ফলে বিশ্ব বাজার থেকে, বিশেষ করে কাতারের মতো দেশ থেকে স্বল্প মূল্যে এবং বাকিতে এলএনজি আমদানির পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। বেসরকারি পর্যায়েও তা কেনা হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৫ বছরে জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
এই চুক্তির ফলে, বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে-প্রতিবছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।
এ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামরিক খাতে কেনাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত রাখার চেষ্টা করবে। তবে কোন কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। এতে সামরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে। ডব্লিউটিওর ভর্তুকি ও পাল্টা ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির বিধান অনুযায়ী তা বাধ্যতামূলক। এর ফলে বাংলাদেশকে কৃষি, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ভর্তুকি কমাতে হবে।
এই চুক্তির আওতায়, বাংলাদেশের বাজারে অবাধে মার্কিন পণ্য বিক্রি বাধ?্যতামূলক করা হয়েছে। চুক্তির ২ দশমিক ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। চুক্তিপত্রের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও অযথা জটিলতামুক্ত। পাশাপাশি এ ধরনের ব্যবস্থা যেন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষুণ্ন না করে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন বা আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালা মেনে তৈরি পণ্য, যার সনদ সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে দেওয়া হয়েছে-এমন মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতিরিক্ত পরীক্ষা বা সামঞ্জস্যের কথা বলে মূল্যায়নের শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ বৈধ সনদ থাকলে পণ্য প্রবেশে নতুন করে বাধা দেওয়া যাবে না।
এই বাণিজ্য চুক্তি চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি বা অন্য কোনো দেশের বাজারে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে-এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কেনার ওপর কড়াকড়ি আরোপের শর্তও রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকানরা আমাদের কাস্টমসের সব ডিজিটাল তথ্যের অধিকার চাইছে, আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ চাইছে। অর্থাৎ তারা আমাদের বন্দর ও কাস্টমসের সব ডেটা হাতে নিয়ে বসে থাকবে এবং উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি জাপানিদের, সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের, স্বার্থ বহুজাতিক কোম্পানির, কিন্তু বাংলাদেশ কাস্টমস বিদেশিদের এজেন্ট হয়ে নিজের দেশের উৎপাদকদের ধরপাকড়ের কাজটি করবে। চুক্তিতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ। এ চুক্তি বহাল থাকলে অধিকাংশ দেশ বা আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তি করতে চাইবে না। আবার কেউ কেউ চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একতরফা সুবিধা চাইবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে তার ইঙ্গিতও দিয়েছে। বস্তুত এটি কোনোভাবেই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নয়।
এটিও অত্যন্ত পরিষ্কার, এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে। চুক্তিতে যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, সেখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা মানা হয়নি, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বেলায় ঠিকই এ বিশ্ব সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ চুক্তিতে একতরফাভাবে মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। চুক্তির সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এ কথিত বাণিজ্যচুক্তিকে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্বার্থজনিত নীতি-কৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চুক্তিতে এমন সব শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারে। বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুতরভাবে হুমকির মুখোমুখি করা হয়েছে। চুক্তিটি ৬০ দিনের নোটিসে বাতিল করার শর্ত আছে। নতুন সরকার সে পথে হাঁটতে পারে। জনগুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত বর্তমান জাতীয় সংসদে এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে; বাণিজ্যসংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পর এ চুক্তির অন্যায্যতা দেখিয়ে সরকার এ চুক্তি বাতিল করতে পারে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।