সুনামগঞ্জে পেট্রোল সংকটে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীবাহী মোটরসাইকেল চালকেরা। চাহিদামতো তেল না পেয়ে জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে নেমেছেন তারা। জেলার প্রায় পাঁচ হাজার চালক সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন এই সংকটে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা, চালকদের বড় একটি অংশের কাগজপত্র না থাকায় তারা পড়েছেন আরও বেশি ভোগান্তিতে। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র অপচেষ্টা চালাচ্ছে বেশি দামে পেট্রোল বিক্রিতে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীবাহী মোটরসাইকেল চালকদের সমিতি রয়েছে ৫০টিরও বেশি। এসব সমিতিতে সদস্য রয়েছেন ৫০ থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত। হাওর-বাওরের এই জেলায় অনেক সড়ক এখনো গণপরিবহনের জন্য উপযোগী নয়। ফলে মোটরসাইকেলই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী এসব মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন।
তবে তেলের সংকটে এই চাকা প্রায় থমকে গেছে এখন। সমিতির নেতারা জানান, চাহিদামতো জ্বালানি না পেয়ে অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ বেকার হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ কৃষিকাজ বা অন্য শ্রমনির্ভর পেশায় ঝুঁকছেন।
জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল চলাচল করত। কিন্তু এখন চালকদের বড় একটি অংশ নিয়মিত রাস্তায় নামতে পারছেন না। স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কের বেহাল অবস্থা এবং বিকল্প যানবাহনের অভাবে যাত্রীদেরও পড়তে হচ্ছে চরম দুর্ভোগে।
জামালগঞ্জের মোটরসাইকেল চালক আরশ আলী প্রায় দুই দশক ধরে এই পেশায় যুক্ত। তার ভাষ্য, একবার যাতায়াতে কমপক্ষে এক লিটার তেল লাগে। দূরের রুটে গেলে পাঁচ লিটার পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না এখন। বাধ্য হয়ে ১৩০ টাকার তেল ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অনেক সময় অন্য চালকদের কাছ থেকেই বেশি দামে তেল সংগ্রহ করতে হয়।
‘বর্তমানে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যায়, তা দিয়ে দিনে ৫০ কিলোমিটারের বেশি চালানো সম্ভব হয় না। ফলে দিনের বড় অংশই বসে থাকতে হয়। গত ১৫ দিনে তার আয় কমে গেছে অর্ধেক।’— যোগ করেন তিনি।
জামালগঞ্জ উপজেলা মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি মো. রিপন মিয়া বলেছেন, ‘উপজেলায় প্রায় ৫০০ চালক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ চালককর্মহীন হয়ে পড়েছেন জ্বালানি সংকটে। একই সঙ্গে যাত্রীরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে।’
তাহিরপুর উপজেলায় ছয়টি স্ট্যান্ডে এক হাজারের বেশি মোটরসাইকেল থাকলেও বেশিরভাগ চালক এখন আর নিয়মিত রাস্তায় নামছেন না। কেউ কৃষিকাজে চলে গেছেন, কেউ অন্য পেশা খুঁজছেন, আবার অনেকে হয়ে পড়েছেন পুরোপুরি বেকার ।
বাদাঘাট এলাকার চালক খোকন মিয়া জানান, আগে দিনে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় করতেন। এখন হাজার টাকাও আয় করা কঠিন হয়ে গেছে। প্রতিদিন ১০ লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও সম্ভব হচ্ছে না সেটি জোগাড় করার।
মধ্যনগরের গাছতলা বাজারের চালক আল আমিন জানান, কয়েকদিন ধরে তিনি মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ রেখেছেন। বিকল্প হিসেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ধান কাটার কাজ শুরু করার।
এদিকে সংকটের সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র। অভিযোগ রয়েছে, কিছু দোকান গোপনে প্রতি লিটার পেট্রোল ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে। আবার কিছু চালক পাম্প থেকে তেল এনে অন্য চালকদের কাছে বিক্রি করছেন বেশি দামে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চালক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জুল হোসেন জানান, কাগজপত্র না থাকায় অনেক চালক পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নিতে পারেন না। এতে করে তারা আরও বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পুলিশি জটিলতার ভয়ও রয়েছে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেছেন, ‘পেট্রোল সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সরকার নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ পাম্পগুলোতে অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি চালকদের কাগজপত্র ঠিক করে নিয়ম মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, যেসব চালকের কাগজপত্র সঠিক, তাদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।