Image description

উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে এক লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকাই রাখা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় ও বিশেষ উন্নয়ন সহায়তায় থোক বরাদ্দ হিসেবে। আর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই থোক বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পে না থাকায় বেশির ভাগ সময় তা ব্যবহৃত হয় না।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার সর্বোচ্চ দুই লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরে সেই উন্নয়ন বাজেট দুই লাখ ৩০ হাজার কোটিতে নামিয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে এ অঙ্ক আরো কমে দুই লাখ কোটিতে নেমেছে।

চলতি অর্থবছরে এডিপির মোট বরাদ্দের মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। গত অর্থবছরে মোট খরচ হয়েছিল এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ছয় হাজার আট কোটি টাকা, আর তাদের উন্নয়ন খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে পাঁচ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আর থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে প্রকল্পে ৩০ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা আর থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগকে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগকে সাত হাজার ৫৬২ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে ছয় হাজার ৮০০ কোটি টাকা, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগকে তিন হাজার ৭৯ কোটি টাকা, বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৩৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অথচ আগের অর্থবছরগুলোতে এমন মন্ত্রণালয় বা বিভাগভিত্তিক থোক বরাদ্দের প্রচলন ছিল না। বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে পাঁচ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হতো। এবারই প্রথম এত বেশি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে বিশেষ প্রয়োজনে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা ছিল ১০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে থোক বরাদ্দ রাখা ছিল ছয় হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে থোক বরাদ্দ রাখা ছিল চার হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এডিপি বাজেট প্রণয়নে একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি কমিয়ে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা করা হলেও আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় বাজেটের একটি বড় অংশই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না, গত বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একই জনবল ও সক্ষমতা দিয়ে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন। ফলে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটে আবার কাটছাঁট করতে হয়।

এখনো অনুমোদন না পাওয়া সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর জন্য দুই হাজার ৫৩৯ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ চেয়েছিল সেতু বিভাগ, তাদের দেওয়া হয়েছে দুই হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। বড় দুই মেগাপ্রকল্প পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেল শেষ হওয়ার পর যখন ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই অনিশ্চিত প্রকল্পে এত বড় অঙ্কের বরাদ্দ চাওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন প্রকল্পে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হলে তা প্রায়ই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা কমিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব বরাদ্দ পরবর্তী সময়ে পুনর্বিন্যাস বা স্থানান্তর করা হয়, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার ইঙ্গিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ কালের কণ্ঠকে বলেন, সেতু বিভাগের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প বর্তমানে পাইপলাইনে রয়েছে, যেগুলো শিগগিরই বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসবে। সেগুলোর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা প্রণয়ন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও অর্থ ব্যয় হবে। আগামী অর্থবছরেই এসব প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

মামুন আল রশিদ বলেন, থোক বরাদ্দ রাখা কোনো ভালো প্রক্রিয়া নয়, কারণ এটি সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ থাকে না। যখন সুনির্দিষ্ট খাত থাকে না, তখন পরবর্তী সময়ে এই টাকা খরচ করার জন্য নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় খাত খুঁজে বের করা হয়।