‘সারাক্ষণ শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকায়, ক্ষত স্থানে প্রচণ্ড ব্যথা, যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারি না, টাকার অভাবে চিকিৎসাও হচ্ছে না’। কথাগুলো লিবিয়ায় দালাল চক্রের হাতে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়া ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের রাঙামুলারকান্দি গ্রামের জিহাদ মোল্লার (২২)। কথা বলার সময় ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না তিনি। ক্রাচে ভর করে এখন তাকে চলতে হয়। কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ঘা। হাতে ও পায়ে নির্যাতনে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। একটি পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। ঘা থেকে পচনের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে তিনি এখনো বেঁচে থাকলেও তার পরিবারের সদস্যদের পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মানব পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে সবকিছু হারিয়ে পরিবারটি দিশেহারা।
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সরেজমিন এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, রাঙামুলারকান্দি গ্রামেন দিনমজুর ফারুক মোল্লার বড় ছেলে জিহাদ মোল্লাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় মনির মল্লিক বিভিন্ন সময় ১৯ লাখ টাকা নেয়। ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি জিহাদকে লিবিয়ায় নিয়ে যায় মনির মল্লিক। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও জিহাদকে ইতালি নিতে পারেনি। এ নিয়ে জিহাদের বাবা ফারুক মোল্লার সঙ্গে মনির মল্লিকের বাদানুবাদ হয়। একপর্যায়ে মানব পাচারকারী মনির মল্লিক জিহাদকে লিবিয়ার স্থানীয় একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। চক্রটি জিহাদকে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। এসময় জিহাদকে মুখে স্কচটেপ মেরে ও হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া হয়। ছেলেকে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে আনতে জায়গা-জমি বিক্রি করে এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ঋণ করে মাদারীপুরের টেকেরহাটে পাচারকারী চক্রের স্থানীয় এজেন্টদের কাছে ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর ২০২৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর জিহাদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এসময় মারাত্মক অসুস্থ জিহাদ বাংলাদেশের এক ব্যক্তির কাছে থেকে চিকিৎসা নেন। পরে ২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর জিহাদের বাবা ফারুক মোল্লা মানব পাচারকারী চক্রের হোতা মনির মল্লিকের কাছে তার পাওয়া টাকা ফেরত চান।
কিন্তু মনির টাকা দিতে অস্বীকার করে এবং ফারুক মোল্লাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ফারুক মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ছেলেকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে ১৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে আমার ছেলেকে তারা বিক্রি করে দেয়। সে সময় তারা নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে আমার কাছ থেকে আরও ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। আমি টাকা ফেরত চাইলে মনির মল্লিক আমার ও পরিবারের নামে একাধিক মামলা করে। আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখায়। মনির মল্লিক লিবিয়ায় থেকে মানব পাচার করলেও তার স্থানীয় এজেন্টরা বেশ শক্তিশালী। তিনি বলেন, আমি আমার পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং বোনদের জমি বিক্রি ও টাকা ধার নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু মনির মল্লিক আমার সব টাকা মেরে দিয়েছে। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। ছেলেটার কোনো চিকিৎসা করাতে পারি না। ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পচন ধরেছে। আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এর বিচার চাই। আমি যদি কোনো বিচার না পাই তাহলে পরিবারসহ সবাইকে আত্মহত্যা করতে হবে। নির্যাতনের শিকার হওয়া জিহাদ মোল্লা বলেন, আমাকে লিবিয়ায় নেওয়ার পর মনির মল্লিক স্থানীয় একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। চক্রটি আমাকেসহ আরও তিনজনকে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন করে। মুখে কাপড় গুজে, হাতে-পায়ে কাঁটাতার দিয়ে বেঁধে না খাইয়ে ৯ দিন রাখে। এ সময় একজন মারা যায়। তাকে তারা অন্যত্র ফেলে দেয়। আমাকে নির্যাতন করে সেই ভিডিও ধারণ করে দেশে থাকা মা-বাবাকে দেখিয়ে টাকা আদায় করে।
জিহাদ জানান, মনির মল্লিক লিবিয়ায় বড় একটি চক্রের হোতা। তার অধীনে সেখানকার বেশকিছু মানুষ কাজ করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে তাদের বিক্রি করে দেয় এবং নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। জিহাদ মোল্লা বলেন, আমি এখন ঠিকমতো চলতে পারি না। আমার কোনো চিকিৎসাও হচ্ছে না। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত মনির মল্লিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, মনির মল্লিক দীর্ঘদিন ধরে আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ব্যবসা করে সে এখন কোটিপতি। তারা জানান, কয়েক বছর আগেও মনির এলাকায় ভ্যান চালাত। এখন দেশে ডুপ্লেক্স ভবন করেছে, এলাকায় বিস্তর জমি রেখেছে। তারা জানান, মনিরের বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দ করলে তাকে হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ফলে ভয়ে অনেকেই তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। আদম ব্যবসায়ী মনির মল্লিকের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আমলে এনে তার বিচার দাবি করেন তারা। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মনির মল্লিক লিবিয়ায় থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দেশে থাকা মনির মল্লিকের স্ত্রী আসমা বেগমের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো কথা বলেননি।