Image description
কারাগারগুলো বেহাল

‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’— কারা বিভাগের এই স্লোগান বন্দিদের মানবিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন কারাগারে অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসাসেবায় মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক বন্দিই হাসপাতালে পৌঁছার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে ৯০৭ জন বন্দি মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২১১ জন, ২০২২ সালে ১৩৯ জন, ২০২৩ সালে ২৩২ জন, ২০২৪ সালে ১৮৯ জন এবং ২০২৫ সালে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়েছে ৪৯০ জনের। এ সংখ্যাটা মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি।

মোট মৃত্যুর মধ্যে বেশির ভাগ বার্ধক্যজনিত ও হার্টের রোগী বেশি বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ৭৫টি কারাগারের মধ্যে ৭২টিতে কারাবন্দি রয়েছে। এসব কারাগারে অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কারা অধিদপ্তরের অধীনে অন্তত ৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে সারা দেশের মাত্র ১৫টি কারাগারে রয়েছে ২২টি অ্যাম্বুলেন্স।

ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়া প্রায়ই বিলম্বিত হয়।

সংশ্লিষ্ট কারা কর্মকর্তারা জানান, বন্দিরা অসুস্থ হয়ে পড়লে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া পিকআপ, সিএনজি, ভ্যান কিংবা অন্য কোনো গাড়িতে করেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। অনেক সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে একাধিক কারাগারের প্রয়োজন মেটাতে হয়। ফলে হঠাৎ কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষা বা বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাত বছর বারবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স কেনার অনুমোদন মিলছে না। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয় কোন পন্থায় এ সমস্যার সমাধান হবে সেটিও দেখাচ্ছে না। অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর ঘটনার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও তাতে কোনো সুফল হয়নি। অন্যদিকে, চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা পেলে এসব মৃত্যুর একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, বিষয়টি শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়, বরং বন্দিদের মৌলিক মানবাধিকার সম্পর্কিত একটি বড় প্রশ্ন। তাঁদের মতে, কারাগারে থাকা ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

কারা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই। ফলে কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়াটাই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৪১। অথচ কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। একজন রাজশাহী কারাগারে এবং অন্যজন মানিকগঞ্জ কারাগারে। বাকি পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য পড়ে আছে।  মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ১৮৬৪ সালের জেলকোড অনুযায়ী রাষ্ট্র বন্দিদের সুচিকিৎসা দিতে বাধ্য। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই আইনের চরম লঙ্ঘন।

এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানো, কারাগারভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁদের মতে, কারা বিভাগের ঘোষিত অঙ্গীকার রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’—বাস্তবে কার্যকর করতে হলে বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলার সুযোগ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, কারাগারের ভেতরে চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা গেলে অনেক অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় স্লোগান ও বাস্তবতার এই বৈপরীত্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে।

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, কারাগার শুধু শাস্তি কার্যকরের স্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বাধীন নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ কারাগারে বন্দিদের জন্য চিকিৎসাসেবা যে পর্যাপ্ত নয়, তা বন্দি ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগেই শুধু নয়, কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও তা অনেক সময়ে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের ঘাটতি, জরুরি রোগী স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক বন্দি সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে কারাগারে মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন কাউকে হেফাজতে নেয়, তখন তার জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। তাই কারাগারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, প্রতিটি কারাগারে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীদের দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মানবিক ও আধুনিক কারা ব্যবস্থার জন্য এটি এখন অপরিহার্য। আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলোর প্রতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজন নাগরিকের মৃত্যু মানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। চিকিৎসার অভাবে বন্দিদের মৃত্যু সংবিধান স্বীকৃত ‘জীবনের অধিকার’-এর পরিপন্থী।

জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা জানিয়ে আসছি, কিন্তু তার কোনো কার্যকর ফলাফল দেখতে পারছি না। ফলে বন্দিদের হাসপাতালে সঠিক সময়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।’ নরসিংদী জেলা কারাগারে জেল সুপার মো. শামীম ইকবাল বলেন, ‘কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স খুবই জরুরি। কিন্তু আমরা বারবার বলেও এ সংকটের সমাধান পাচ্ছি না। কারা কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে আছে, সামনে কী হবে জানি না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হোক।’ 

কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. দিদারুল আলম বলেন, অন্যান্য অনেক কারাগারের মতো আমাদের এখানেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু কবে পাব, সেটা বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে কেবিন পিকআপ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। একই কথা বলেন পাবনা জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, আমাদের সিঙ্গল কেবিন পিকআপ দিয়ে রোগী বহন করতে হচ্ছে।