নানা ধরনের বিক্ষোভ, অবৈধ সমাবেশ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র-সরঞ্জামের মজুত বাড়াচ্ছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে টিয়ার গ্যাসের শেল, ফ্লেয়ার পিস্তল কার্তুজ, ওয়াটার ক্যানন ট্রাক ও ক্রু-সার্ভড মেশিনগান কেনার জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কেনার তালিকায় মেশিনগানও রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি নথি থেকে এ তথ্য মিলেছে। তথ্যানুযায়ী, অ-প্রাণঘাতী এসব অস্ত্রের সঙ্গে ক্রু-সার্ভড শ্রেণির প্রাণঘাতী অস্ত্রও রয়েছে কেনার তালিকায়।
টিয়ার গ্যাসের শেল এবং ওয়াটার ক্যানন (জলকামান) সাধারণত উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার কাজে ব্যবহার করে আসছে পুলিশ। ফ্লেয়ার পিস্তলের কার্তুজ মূলত জরুরি অবস্থায় সংকেত দেওয়ার জন্য নিক্ষেপ করে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাধারণত উদ্ধার অভিযানের সময় বিপদের সংকেত হিসেবে এটি কাজে লাগানো হয়। আর ক্রু-সার্ভড মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র চালানোর জন্য একাধিক সদস্যের সমন্বিত দল প্রয়োজন হয় এবং এটি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি পরিমাণ গুলিবর্ষণের সক্ষমতা রাখে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর এই প্রথম বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (অস্ত্র ও গোলাবারুদ) মো. মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ১৫ মার্চের এক আন্তর্জাতিক টেন্ডারে উল্লেখ করা হয়, ৮০ হাজার ৩৮ মিলিমিটার লং রেঞ্জ টিয়ার গ্যাসের শেল, ৩৮ মিলিমিটার (৩ মিউনিশন) টিয়ার গ্যাসের শেল ১ লাখ ২০ হাজার এবং ১০ হাজারটি ২৬ মিলিমিটার ফ্লেয়ার পিস্তল কার্তুজ কেনা হবে। এই তিন ক্যাটাগরির জন্য টেন্ডার জামানত ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ অন্তত ৭৮ লাখ টাকা। পৃথক আন্তর্জাতিক টেন্ডারে ২৫টি ক্রু-সার্ভড মেশিনগান কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার জন্য জামানত নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭৫ টাকা।
অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (পরিবহন) মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ওয়াটার ক্যানন ট্রাক (সফট স্কিন, সর্বোচ্চ ১০ হাজার লিটার ক্ষমতা) চেয়েছেন। এই টেন্ডারের জামানত নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার মার্কিন ডলার। বর্তমান ডলারের বাজারদর অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সর্বোচ্চ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা। তবে কতটি যান কেনা হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
অস্ত্র, টিয়ার গ্যাসের শেল, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামগ্রী কেনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে কালবেলার পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বক্তব্য চেয়েও পাওয়া যায়নি।
তবে কেনাকাটার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালবেলাকে বলেন, ‘এটি নিয়মিত কেনাকাটার অংশ। অনেক কিছুরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো নতুন করে লাগবে। কেনাকাটায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য সরকারি বিধি মেনে আন্তর্জাতিকভাবে টেন্ডার দেওয়া হয়েছে।’
যদিও পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে একাধিক বিক্ষোভের কারণে মজুত কমে যায় বা অনেক সরঞ্জামের মেয়াদ শেষ হয়ে পড়ে। নতুন করে সম্ভাব্য বিক্ষোভ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই মজুত বাড়ানো হচ্ছে বলে জানায় সূত্রটি। সূত্রটি আরও দাবি করে, ভবিষ্যতে নানা কারণে বিক্ষোভ হতে পারে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে পুলিশ।
এর আগে টিয়ার গ্যাসের শেল সাধারণত ব্রাজিল থেকে আমদানি করা হতো। তবে এবার টেন্ডারে উৎস বা মোট খরচ উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যয়ের তথ্য প্রকাশেও অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশর বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাট হয়। একই সঙ্গে গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ভারী অস্ত্রও লুট হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ওইসব মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও নানা ধরনের অস্ত্র ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী তখন পর্যন্ত দুই হাজার ২৫৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল, যা লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছিল, যা লুট হওয়া গোলাবারুদের প্রায় ৫২ শতাংশ।