Image description

মাত্র আট দিনের ব্যবধানে ঢাকায় চাঁদাবাজদের বেপরোয়া কর্মকা- প্রত্যক্ষ করলো সাধারণ মানুষ। চাঁদার টাকা না পেয়ে হামলার অসংখ্য ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। এতে জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। এসব চাঁদাবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা থাকলেও নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে নিষ্ক্রিয় রয়েছে পুলিশ। গত শনিবার সন্ধ্যায় কাফরুলে এ কে এম অ্যাপারেলস গার্মেন্টস কারখানায় ১২ থেকে ১৩ জন চাঁদাবাজ প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরুলের কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি করলে দুজন পিস্তল বের করে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। পরে তার অফিসের লকার ভাঙচুর করে এবং তিন দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। চলে যাওয়ার সময় চাঁদাবাজরা সিসি ক্যামেরার ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে চলে যায়। চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের টেন্ডার দিতে রাজি না হওয়ায় প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের উপপরিচালক ড. আহমদ হোসেনকে। ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে সোমবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পেছনের গলিতে এ ঘটনা ঘটে। গত ১০ এপ্রিল শ্যামলীতে কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় ঢুকে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন মঈন উদ্দিন। সেদিন আরো ৬০ থেকে ৭০ জনকে নিয়ে একদল চাঁদাবাজ হাসপাতালে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করে। ১১ এপ্রিল থানায় মামলা করা হলেও পরের দিন মঈনসহ সাতজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে চাঁদাবাজির ঘটনা। কোথাও চাঁদা না দেয়ায় হত্যার হুমকি, কোথাও চাঁদার দাবিতে সশস্ত্র হামলা, আবার কোথাও ব্যবসায়ী কিংবা হাসপাতাল পরিচালকের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করছে দুষ্কৃতকারীরা। শিল্পকারখানার মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এমনকি সাধারণ মানুষও তাদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ফলে এ নিয়ে জনমনে ভীতি ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাঁদাবাজি এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এ চাঁদাবাজরা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব খাটাচ্ছে। সুযোগ বুঝে তারা রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখছে। ঢাকায় চাঁদাবাজির এমন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজরা প্রকাশ্যে তৎপর থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয় না। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবিÑ প্রতিটি ঘটনায় মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিনব নানা কায়দায় চাঁদাবাজি করে আসছে প্রভাবশালী মহল। চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতর থেকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া বা মনিটরিং হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের উপপরিচালককে ছুরিকাঘাত : রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে টেন্ডার দেয়ার জন্য বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি এবং বাসায় ফেরার পথে হাসপাতালের উপপরিচালক ড. আহমদ হোসেনকে (৫০) ছুরিকাঘাতে আহত করেছে দুর্বৃত্তরা।

বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মেহেদী জানান, আহত উপপরিচালককে বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশি নম্বর থেকে টেন্ডার দেয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিল একটি চক্র। সোমবার ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পেছনের গলিতে তাকে ভয় দেখানোর জন্য পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় দুই যুবক। পরে তাকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি আরো জানান, আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আসামিদের ধরার চেষ্টা চলছে।

কোটি টাকা চাঁদা না দেয়ায় মিরপুরে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীকে গুলি : রাজধানীর মিরপুরে এক গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে গুলি ছুড়েছে সন্ত্রাসীরা। পরে প্রমাণ নষ্ট করতে কারখানার সিসিটিভি ক্যামেরাও খুলে নিয়ে যায় তারা। শনিবার বিকাল সাড়ে ৬টার দিকে মিরপুর-১৩ নম্বরের পশ্চিম বাইশটেকি এলাকায় অবস্থিত ‘এ কে এম অ্যাপারেলস’ নামের একটি পোশাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। রোববার গার্মেন্ট মালিক কামরুল ইসলাম রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ১২ থেকে ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলা ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, শনিবার কামরুল ইসলাম তার কারখানার অফিসে অবস্থান করছিলেন। বিকালের দিকে ১২-১৩ জনের একটি দল জোরপূর্বক অফিসে ঢুকে তার কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা পিস্তল বের করে তাকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলির একটি কামরুল ইসলামের বাম কানের পাশ ঘেঁষে পেছনে থাকা ফাইল কেবিনেটের গ্লাসে আঘাত করলে সেটি ভেঙে যায়। অন্য গুলিটি তার পেছনের দেয়ালে লাগে। এ সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে তারা তিন দিনের মধ্যে এক কোটি টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী কামরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর পুলিশ এসে গুলির খোসা ও বুলেট উদ্ধার করেছে।

কাফরুল থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাফরুলে এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে গুলির ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। রোববার রাতে ঢাকার মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪-এর একটি আভিযানিক দল। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলোÑ রানা (৩১), মো. সাগর শেখ (২৮), মো. কালু (২৮) ও শশী (২২)।

সূত্র জানিয়েছে, ঢাকায় তালিকাভুক্ত ১৪০ জন শীর্ষ চাঁদাবাজ রয়েছে। চাঁদাবাজদের তালিকায় সর্বাধিক সংখ্যা পুরান ঢাকা, মতিঝিল, খিলগাঁও, কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পল্লবীতে। পুলিশ সদর দফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর প্রধানদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তি বার্তা পৌঁছা তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এই কর্মকর্তা বলেন, আপাতত মহানগর পুলিশকে চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের তালিকা করে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হলেও ডিএমপি কর্মকর্তারা চাঁদাবাজরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সেল্টারে থানায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করছে। বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজির ঘটনায় র‌্যাব জড়িতদের গ্রেফতার করলেও ডিএমপি ডিবি বা থানা পুলিশ সক্রিয় নয়।