Image description

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে তেল পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটে ভুগছে বাংলাদেশও। তেলসংকটের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবনে। এরই মধ্যে সরকার বিশাল ভর্তুকির বোঝা কমাতে এবং তেলের অবৈধ মজুতদারি ঠেকাতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এতে এখন পর্যন্ত ভোগান্তি খুব একটা না কমলেও গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঘোষণা ছাড়াই ঢাকার কিছু রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। জ্বালানিসংকটের প্রভাবে এরই মধ্যে গোটা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করেছে। গতকাল মধ্যরাতে সারা দেশে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের লোডশেডিং হয়। গ্রামাঞ্চলে এখন বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। তেলের সংকটে জেনারেটর চালাতে না পেরে দেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে কৃষক সেচের জন্য জেনারেটরে প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। হাসপাতালে জেনারেটর বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ বাড়ছে রোগীদের।

বেড়েছে পরিবহনভাড়া : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এক দিন পরই পরিবহন মালিকরা যাত্রীভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু করেন। ঘোষণা না দিয়েই গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন রুটে লোকাল বাসের যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। এতে বাসের হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। প্রায় সব গন্তব্যেই যাত্রীপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা করে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। গতকাল আগারগাঁও থেকে আলিফ পরিবহনে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবিদ হোসেন ডেমরা যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, এ রুটে ভাড়া অন্য সময় ৫০ টাকা নেওয়া হলেও গতকাল ৬০ টাকা নেওয়া হয়।

লোডশেডিং পৌঁছেছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটে : জ্বালানিসংকটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা একদিকে বাড়ছে অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি গ্যাস ও তেলের সংকটে পরিস্থিতি দিনদিন খারাপ হচ্ছে। শহওে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। গত কয়েক দিনে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে দিন ও রাতের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্যমতে গতকাল মধ্যরাত ১টার দিকে ১ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এর মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানিসংকটের কারণে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ এখন উৎপাদিত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে গড়ে ১১ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।

জেনারেটর বন্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পোৎপাদন, সেচকাজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা : জ্বালানিসংকটের কারণে কারখানা, সেচকাজ ও হাসপাতালের জেনারেটরগুলো বন্ধ আছে। এতে পোশাকসহ অন্য কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনেক কারখানার মালিকরা জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেল ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় তেল যথাসময়ে পাচ্ছেন না। এতে উৎপাদনের পাশাপাশি সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারের কাছে আবেদন কওে পোশাক কারখানার মালিকরা সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যয়নপত্র দেখিয়ে পেট্রোলপাম্প থেকে তেল সংগ্রহ শুরু করেছেন। আবার ডিজেলসংকটের কারণে সেচ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক জেনারেটর দিয়ে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। আগে পাম্প থেকে ট্যাংকিতে করে তেল দেওয়া হলেও এখন সেটি না দেওয়ায় কৃষক ভোগান্তিতে পড়েছেন। আবার দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। জেনারেটর না চলায় অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি ও জরুরি বিভাগের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মোমবাতির আলোয় কোনোমতে জরুরি সেবা চললেও গরমে রোগীদের ভোগান্তি বেড়েছে।

টেলিকম সেবা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা : ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের কারণে সারা দেশে টেলিকম সেবা বিঘ্নিত হতে পাওে, এমন আশঙ্কা করছেন দেশের মোবাইল অপারেটররা। এর ফলে ডেটা সেন্টারসহ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সমস্যায় পড়তে পারে। এরই মধ্যে অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পেতে সমস্যায় পড়ছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) শনিবার পাঠানো জরুরি চিঠিতে অপারেটররা বলেছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের দ্রুত সাহায্য ছাড়া টেলিকম সেবা চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের সংগঠনের (এএমটিওবি) নেতারা তাঁদের চিঠিতে জানান, এখন প্রায় প্রতিদিনই ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না এবং তাঁদের বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম চালাতে হচ্ছে। শুধু বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালাতেই প্রতিদিন অপারেটরদের ৫২ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল এবং প্রায় ২০ হাজার লিটার অকটেন খরচ হচ্ছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, এ অবস্থায় ঠিকভাবে যদি জ্বালানি সরবরাহ করা না যায় এবং ডেটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ব্যাপক কল ড্রপ, ইন্টারনেট বিভ্রাট ও টেলিকম সেবায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।