দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কোনোরকমে টিকে ছিলেন অদম্য সাহসী নারী দিপালী আক্তার। জীবন বাঁচাতে পদ্মা থেকে মাছ ধরে কিংবা চরের কাশবন থেকে কাশফুল এনে বিক্রি করতেন। বাবা, দুই ভাই আর দুই বোনের সংসারের দুঃখ ঘোচাতে পাড়ি জমান বিদেশে। পরিবারে সচ্ছলতাও ফিরিয়ে আনেন।
সংসারের অভাব, দারিদ্র্য ঘোচাতে যিনি বিদেশের মাটিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন, সেই দিপালী আক্তারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দিপালী আক্তার ৮ এপ্রিল সন্ধায় লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন। তিনি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের পূর্ব শালেপুরের মুন্সীরচর গ্রামের শেখ মোফাজ্জেল ওরফে মোকা শেখের মেয়ে। দিপালীর মা রাজিয়া বেগম ৮ বছর আগে বজ্রপাতে মারা যান। বাবা শেখ মোফাজ্জেল জানান, ‘আমার মাইয়াড্যার মুখখান দেখবার চাই’, তারে দেশে আইন্যা মাটি দিবার চাই, আপনারা আমার মাইয়াড্যারে আনবার ব্যবস্থা কইরা দ্যান।’ শুধু দিপালী নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের আটজন নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের পরিবারের কান্না থামছে না। কেউ বাবা, কেউ সন্তান, কেউ ভাই, কেউ বা বোন হারিয়েছেন, যারা প্রবাসে চাকরি করে কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাতেন দেশে পরিবারের সুখশান্তির জন্য। ইরান যুদ্ধ শুধু এই পরিবারগুলোর সুখ কেড়ে নিয়ে গেছে তাই নয়, চিরতরে নিয়ে গেছে প্রিয় স্বজনটিকেও। এখন নিহতদের অসহায় পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সন্দ্বীপের তারেকের পরিবার অথৈ সাগরে : বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তারেক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাসন্তান। গত ২ মার্চ বাহরাইনের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের অংশবিশেষের আঘাতে তারেক মারা যান। গত ৩ এপ্রিল তার লাশ দেশে আসে। পরদিন চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর বউবাজার এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সৌদিতে নিহত বাচ্চু মিয়ার পরিবার চলছে খেয়ে না খেয়ে : সৌদি আরবে হামলায় নিহত কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাচ্চু মিয়ার পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে জীবন চালাচ্ছেন। একদিকে অভাব, অন্যদিকে ৪০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা। সবদিক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি। ইরান যুদ্ধের বলি হয়েছেন কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ফেকামারা গ্রামের রইস উদ্দিনের ছেলে বাচ্চু মিয়া (৩৫)। গত ৮ মার্চ সৌদি আরবের আল-খারজ শহরের ‘আল তুইক বলদিয়া কোম্পানির’ একটি শ্রমিক ক্যাম্পে মিসাইল হামলায় নিহত হন তিনি। পরে সৌদি আরবেই তাকে দাফন করা হয়।
ভালো নেই সালেহ আহমদের পরিবার : প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় চলছে ইরান যুদ্ধে নিহত সালেহ আহমদের পরিবারের সংসার খরচ ও ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া ও চিকিৎসা। সালেহ আহমদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে। ১ মার্চ চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে আরব আমিরাতে মৃত্যুবরণ করেন সালেহ। নিহত সালেহ আহমদের বড় ছেলে আবদুল হক বলেন, আমরা ৩ ভাই ১ বোন ও মা মিলে ৫ জনের সংসার। আমাদের পরিবারে আমাদের বাবাই ছিলেন একমাত্র আয় রোজগারকারী ব্যক্তি।
মাথা গোঁজার ঠাঁই চান যুদ্ধে নিহত শাহ আলমের পরিবার : মাথা গোঁজার ঠাঁই চান আমিরাতে যুদ্ধে নিহত কুমিল্লার শাহ আলমের পরিবার। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের জিরুইন গ্রামের বাসিন্দা তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের সময় সৃষ্ট ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে নিহত হন শাহ আলম ভূইয়া। তার লাশ ৮ দিন পর নিজ গ্রামে পৌঁছে। ৯ এপ্রিল বিকালে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স যোগে উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের জিরুইন গ্রামে তাঁর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত মোশারফের স্ত্রী : সৌদি আরবে মিসাইল হামলায় নিহত মোশারফের দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্ত্রী কবরী আক্তার। বড় ছেলে মাহিম (১৪)। সে স্থানীয় কেজিকে উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ছোট ছেলে মিহান (৮) স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। দুই ছেলে ছাড়া এখন আর কোনো ভরসা নেই মোশারফের স্ত্রী কবরী আক্তারের।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মার্চ সৌদি আরবে মিসাইল হামলায় নিহত হয় মোশারফ (৩৫)। গত ২০ মার্চ লাশ দেশে আসে। তার গ্রামের বাড়ি সখীপুরের গজারিয়া। তার পিতার নাম সূর্যত আলী। কবরী আক্তার বলেন, মোশারফের লাশ যখন দেশে এলো তখন সরকারের পক্ষ থেকে ৩৫ হাজার টাকার একটি চেক দিয়েছিল। তারপর আর কোনো অনুদান বা অর্থ সহযোগিতা পাই নাই আমরা। সৌদি কোম্পানির কাছ থেকে এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। মারা যাওয়ার দুই দিন আগে আমার স্বামী দেড় লাখ টাকা দেশে পাঠিয়েছিল। এখনো সেই টাকাও পাই নাই। আর পাব কি না জানি না।