অর্থনীতির দুরবস্থা, জ্বালানি সংকট এবং হামের কারণে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সরকার অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। যদিও মাত্র ২ মাস পূর্ণ হওয়া নতুন সরকার এর কোনোটির জন্য দায়ী নয়। জ্বালানি তেলের সমস্যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে। অর্থনৈতিক সংকট বিগত সরকারগুলোর সময়ের সৃষ্ট। হামের প্রাদুর্ভাবও বর্তমান সরকারের সৃষ্ট নয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও এসব সমস্যা বর্তমান সরকারের ‘ঘাড়ে’ এসে পড়েছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ভাবে সমস্যাগুলো এমনভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে যেন সরকারই এজন্য দায়ী।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এক্ষেত্রে সরকারের দায় হলো, তারা সমস্যাগুলো সঠিকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরছে না। বরং কিছু বিষয় উহ্য রেখে এমন সব তথ্য জনসমক্ষে আনছে যাতে সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। জনগণের এতে উপকারও হচ্ছে না। যেমন, সরকার বলছে, ‘বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে। কিন্তু মাঠের চিত্র হচ্ছে, জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রাহকরা সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব মেলাতে পারছেন না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হামের নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় নতুন সরকারের আমলে রোগটির প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যাপ্ত টিকাসহ হাম প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন এ রোগে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এ পর্যন্ত হাম ও এ রোগের উপসর্গে দুই শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সৃষ্ট, যা গত ১০ বছর ধরে দেশে আলোচিত বিষয়। উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। কিন্তু মাত্র ২ মাসে এসব সমস্যার কোনোটিই সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সব সমস্যা রাতারাতি সমাধান হবে এমন প্রত্যাশাও জনমনে নেই। তবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কোথায় এবং কী কারণে সংকট তৈরি হয়েছে সেগুলো জনগণকে জানানো জরুরি বলে তারা মনে করেন। তাদের মতে, কোনো কিছু নিয়ে লুকোচুরি না করে সরাসরি জনগণকে তা জানানো উচিত, যাতে তারা বিভ্রান্ত না হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সরকার তো মাত্র ২ মাস পূর্ণ করল। আর এই সমস্যাগুলো তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ফলে এজন্য সরকারকে দায়ী করা যাচ্ছে না। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এখানে সরকার সমাধানের জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছে। বিকল্প বিভিন্ন জায়গা থেকে তেল আনার চেষ্টা করছে। তেল দেশে আসছেও। তিনি আরও বলেন, তবে এর সঙ্গে দেশে জ্বালানির ব্যবহারের বিষয়েও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই যত রকমভাবে সম্ভব কৃচ্ছ সাধন করতেই হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে বড় বড় শহরের নাগরিকদের সচেতন ও মিতব্যয়ী হতে হবে। আর এটা করতে গেলে সবাইকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। আর সরকারের এটা করাও উচিত। কারণ এই সংকটের জন্য তো সরকার দায়ী নয়। সংকটগুলো অযাচিতভাবে সরকারের ঘাড়ে এসে পড়েছে। ফলে সরকারের অবশ্যই উচিত সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। সরকারকে একদিকে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি তাদের নেওয়া সব পদক্ষেপও জানাতে হবে। এগুলো করা গেলেই জ্বালানিসহ অন্যান্য সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবে না।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি সংকট আগে থেকেই ছিল। যুদ্ধের কারণে এটা আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এটা অন্য আরও নানা কারণেই হতে পারত। কিন্তু এ ধরনের সমস্যায় আমাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা গেছে কিনা, সেটা দেখতে হবে। এগুলো মোকাবিলা বা সমন্বয় করার সক্ষমতা সরকারের আদৌ আছে নাকি অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে; এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, সমস্যা মোকাবিলা করতে যেসব কৌশল নিতে হবে, সেই জায়গাটায় সরকারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এটা হচ্ছে মূল কথা। সরকার তো কোনো ব্যক্তি নন। সরকার মানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সরকার মানে প্রতিযোগিতা কমিশন। সরকার মানে বিএসপি, বিপিসি, বিটিসি, পেট্রোবাংলা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরা সবাই নিষ্ক্রিয়, অক্ষম-অদক্ষ। এই কাঠামোগুলো এমন হয়ে গেছে। এটা ভাঙতে না পারলে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে এটা মোকাবিলা করতে হবে। কারণ এখানে অনেকেরই অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় যুক্ত। সরকারকে সেটা চিহ্নিত করতে হবে। এখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তাদের মতামত নিতে হবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের বিষয়ে সার্বিক তথ্য বিস্তারিতভাবে নিয়মিত মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক এমএম আকাশ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত হলো একটা স্বচ্ছ হিসাব দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে আমাদের আসলেই কত জ্বালানি আছে, সেই জ্বালানি দিয়ে আমরা কতদিন চলতে পারব। সেটা কোথায় আছে এবং কিভাবে বণ্টন হচ্ছে, তাও জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রতিমাসে সঠিক হিসাব-নিকাশ দিলে এই কৃত্রিম আশঙ্কা ও মজুতের পরিমাণ কমে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হামের এই সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা না দেওয়ার কারণে-এমন মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, হাম প্রতিরোধের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান ঠিক আছে। তারা জরুরি অবস্থা বিবেচনায় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগে টিকা বিদেশি টাকায় কেনা হতো। বিদেশি টাকায় কেনাকাটার অডিটে অত কড়াকড়ি হতো না। কিন্তু এখন তো বাংলাদেশ সরকারের টাকায় কিনতে হবে। এখানে নিয়মকানুন অনেক জটিল, অনেক আমলাতান্ত্রিক। ফলে জরুরি অবস্থার জন্য একদিকে নিয়মকানুন শিথিল করতে হবে। আবার খেয়াল রাখতে হবে চুরিও যেন না হয়। এক বছর অডিট করতে গিয়ে আটকে দিলে দেখা গেল পরের বছরের টিকা কেনা হলো না; এই অবস্থা যেন না হয়।
বর্তমান সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক এই জিএস বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাটাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সবাই যদি ঢাকা শহরে আসে তাহলে তো রোগী বাঁচবে না। শিশুরা যেন তার বাড়ির কাছেই সেবাটা পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সবাই যেন সফলভাবে টিকা পায় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিষয়ে সরকারকে বাড়তি নজর দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।