Image description
বিএনপির ত্যাগীদের মূল্যায়ন

স্কুলের বেঞ্চ থেকে রাজপথ। হাতে বই থেকে ব্যানার, মিছিলে স্লোগান। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়টুকু কেটেছে আন্দোলনের মাঠে। মামলা, হামলা, গ্রেফতার আর জেলজীবন ছিল নিত্যসঙ্গী। কারও শরীরে এখনো গুলির দাগ, গভীর ক্ষত। কেউ হারিয়েছেন প্রিয়জন, কেউ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে টিকে ছিলেন সংগ্রামে। আতঙ্কে অসংখ্য রাত কেটেছে ধানখেতে, খোলা আকাশের নিচে, সুপারি বাগানে আবার কখনো কবরস্থানে। প্রত্যাশা ছিল-দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে একদিন মিলবে ত্যাগের স্বীকৃতি। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে, ক্ষমতায় এসেছে নিজেদের দল বিএনপি। কিন্তু তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর অভিযোগ-তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বঞ্চনার কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। ত্যাগ আছে, কিন্তু মূল্যায়ন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মুখে মুখে। তারা বলছেন, রাজনীতি করলে কিছু ভুলভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু অনেক নেতাই আছেন, যাদের বিএনপির ‘ব্র্যান্ড’ বলে মনে করা হয়। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, রুহুল কবীর রিজভীসহ এমন অনেকেই আছেন-যারা বিগত দেড় যুগ দলকে আগলে রেখেছেন। লড়াই করেছেন। তাদের কাউকে কাউকে শেখ হাসিনা সরকার নানা প্রলোভন দিয়ে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকের মতে, ত্যাগী এসব নেতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং এমন অনেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন, যাদের নাম অনেক বছর ধরে শোনা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তারা বীরের মতো লড়েছেন। নানাভাবে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। সবাইকে দল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে। তবে অনেকেই হতাশার কথা বলছেন, আশা করি একটা সময় সার্বিক পরিস্থিত তারা বুঝতে পারবেন। সবেমাত্র বিএনপি সরকার গঠন করেছে। দেশ গঠনের কাজ চলমান। পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় দেড় লাখ মামলায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। কারও কারও বিরুদ্ধে জমেছে মামলার পাহাড়।

দলটির নেতারা জানান, হাসিনা সরকারের সময়ে কারাগারে ও রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন অনেকে। একটা সময় আদালতের বারান্দা হয়ে উঠেছিল তাদের জীবনের বড় অংশ। এমনও ঘটনা ঘটেছে, মূল ব্যক্তিকে না পেয়ে মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেকে গুম হয়েছেন, আবার নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিএনপির রাজনীতি করার কারণে কারাগারের কনডেম সেলেও রাখা হয়েছিল অনেক নেতাকর্মীকে। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কারও হয়েছে অঙ্গহানি। আবার কেউ শরীর ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অসহনীয় যন্ত্রণা। বাড়িঘর, জমিজমা, এমনকি গবাদি পশুও বিক্রি করে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ কেউ ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েও আন্দোলনের খরচ জুগিয়েছেন।

নেতাকর্মীদের মতে, এই দীর্ঘ ত্যাগ ও কষ্টের পেছনে ছিল একটাই স্বপ্ন-দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। দল তাদের পাশে দাঁড়াবে, দেবে যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী এখনো উপেক্ষিত। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুনভাবে যুক্ত হওয়া বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই দখল করে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। এতে হতাশা বাড়ছে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে।

অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত। কেউ কেউ সরাসরি দলের কাছে ত্যাগের স্বীকৃতি দাবি করছেন। তাদের মতে, শুধু ক্ষমতায় আসাই শেষ কথা নয়, যারা এই পথ তৈরি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিএনপির রাজনীতিতে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে এমন অনেকদিন ছিল, দলীয় কার্যালয়ে ঝড়ের বেগে প্রেস ব্রিফিং করে আবারও আত্মগোপনে যেতে হয়েছে রিজভীকে। কারণ, দলের বেশির ভাগ নেতা তখন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিত্বের বদলে রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। বিএনপির যুগ্মমহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হিসাবে দীর্ঘ সময় আদালত ও কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তার অনুসারীদের প্রত্যাশা ছিল-গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি এমপি, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়িত হবেন। তবে কোনোটিই ঘটেনি।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল তিন শতাধিক মামলার আসামি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন জোরালো করতে নেতাকর্মীদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। পিকেটিংসহ প্রতিটি মিছিল, মিটিংয়ে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বেশ কয়েকবার রাজপথ থেকে গ্রেফতারও হন। রিমান্ডে তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। রাত কাটিয়েছেন কারাগারের কনডেম সেলে। একদিকে রিমান্ডে নির্যাতন, অন্যদিকে কারাগারে বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হলে ফেলে দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মালিবাগে হরতাল চলাকালে বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৪ জন নিহত হন। ওই সময় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গুলিবিদ্ধ হন। তার মেরুদণ্ডে দুবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির সেই ক্ষত। মায়ের মৃত্যুর সময় ছিলেন কারাগারে। মৃত্যুর ৩ দিন পর ৮ ঘণ্টা প্যারোলে রংপুর থেকে বরিশালে নেওয়া হলেও মায়ের মুখ আর দেখতে পারেননি তিনি। আলালের সাড়ে ৩ বছর সাজার রায় দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেও কারাগার থেকে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নানা বার্তা দিতেন নেতাকর্মীদের। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাকেও এমপি, মন্ত্রী কিংবা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে চেয়েছেন নেতারা। এত ত্যাগের পরও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ।

জানতে চাইলে আলাল যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে আমাদের বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি সবকিছু অবগত রয়েছেন। চেয়ারম্যান যথাসময়েই দলের ত্যাগী নেতাকর্মী যারা আছেন, তাদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবেন। এই বিশ্বাস আমার আছে।’

ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলও আন্দোলনের সময় সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলীয় পদে না থেকেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তার। ২০২৪ সালে ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হলেও তাকে কোথাও রাখা হয়নি। এ নিয়ে তার অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। জানা যায়, তার কমিটির সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমিটি ভেঙে দেওয়ার পরপরই বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে জায়গা পেলেও বঞ্চিত হন জুয়েল।

এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল, যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক সভাপতি রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো হাজারো ত্যাগী নেতার যথার্থ মূল্যায়ন চান দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

এ প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান দুদু যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত সবাই তো (ত্যাগী নেতা) এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রত্যাশিত পদ পাবেন না। কারণ, পরিবর্তনের পর একটা পার্টি পছন্দমতো জায়গায় সবাইকে স্থান দিতে পারবে-এমনটা ভাবা উচিত নয়। সেদিক থেকে সরকারের মেয়াদ দুই মাস পেরোয়নি। এখনই কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

সম্প্রতি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নয়াপল্টনে যাওয়ার খবরে আগে থেকেই হাজারো নেতাকর্মী ভিড় করেন ওই এলাকায়। নিরাপত্তার কারণে অনেকেই দেখা করতে পারেননি। বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী তাদের ত্যাগের কথা তুলে ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

ইমন নামের এক যুবদল কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা ভিডিওতে বলেন, ‘আমরা এই পার্টি অফিস (নয়াপল্টন) পাহারা দিতাম। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এখন আমরা ধাক্কা খাই। এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। একটি পায়ে ডিভাইস, তারপরও ছুটে আসি প্রিয় নেতাকে দেখার জন্য। কিন্তু দেখতে পারি না। অনেক কষ্ট হয়। যখন দেখি যে আমরা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাই। এই জিনিসগুলো কষ্ট লাগে। শরীরে গুলি লেগেছে। অনেকগুলো এখনো শরীরে।’