Image description
ইআরএলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশে এপ্রিল ও মে মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত আছে। বর্তমানে জুন মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি সংগ্রহে দুর্ভোগ কমাতে ফুয়েল পাশসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল) পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পেট্রোলপাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ার বিষয়টি সরকারের নজরে আছে। তবে দেখার বিষয়, পাম্পগুলোতে অস্বাভাবিক চাহিদা কেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করার অনুরোধ জানান।

কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তা দেখানোর জন্য জ্বালানি বিভাগ একদল সাংবাদিককে শোধনাগার ঘুরিয়ে দেখায়। ইআরএল কর্তৃপক্ষ জানায়, শোধনাগারের মূল দুটি ইউনিট এখন বন্ধ। তবে বিটুমিনসহ উপজাত উৎপাদনের বাকি দুটি ইউনিট নিয়ন্ত্রিতভাবে চালু আছে। এ ব্যাপারে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, ফুল ক্যাপাসিটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি যদি রান না করে, তাহলে যেন জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে-সেজন্য সরকার পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহের মাত্রা বাড়িয়েছিল। আমি দায়িত্ব নিয়ে এবং গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমাদের মজুত আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা পত্র-পত্রিকায় দেখেছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পর্যন্ত আশঙ্কা করছে যে, তাদের হাতে মাত্র ছয় সপ্তাহের জেট ফুয়েল রয়েছে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, ছয় সপ্তাহ সমপরিমাণ জেট ফুয়েল আমাদেরও রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের যে পরিমাণ জ্বালানি চাহিদা রয়েছে সেটি আমরা সংগ্রহ করেছি এবং সেটি নিশ্চিত সরবরাহ লাইনে আছে। এপ্রিল এবং মে মাসের চাহিদা পূরণের পূর্ণ সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। আমরা এখন মূলত জুন মাসের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করছি।’

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমরা ফুয়েল পাশের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেছি, আমাদের আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। আমি ভীষণভাবে আশাবাদী, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই (জ্বালানির জন্য) লম্বা লাইন সংক্ষিপ্ত হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে। অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানের র-মেটেরিয়ালস বলতে যেটা বোঝানো হয়, সেটি হচ্ছে ক্রুড অয়েল, যেটি মূলত দুটি সোর্স থেকে আসে। একটি হচ্ছে সৌদি আরব, অপরটি আরব আমিরাত। জানুয়ারি মাসে যে কার্গো আসার কথা, সেটি এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে যে ক্রুড অয়েল আসার কথা ছিল, সেটিও এসেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরু হওয়ার পর মার্চ ও এপ্রিল মাসের শিডিউল হ্যাম্পার করেছে।’ বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা যেমন রিফাইন অয়েল অ্যাজ অয়েল অ্যাজ ক্রুড অয়েলও সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি। আমরা একটা কার্গো ক্রয়ও করেছি, যদিও সেটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাপ্লাই দিতে পারেনি। আরও দুটি কার্গো (ক্রুড অয়েলের) স্ট্যান্ড বাই রয়েছে, আমরা আশা করছি এই মাসের শেষদিকে একটি কার্গো শিপ পৌঁছাবে। এ অবস্থায় সাময়িকভাবে আমাদের যে প্রডাকশন ক্যাপাসিটি (ইস্টার্ন রিফাইনারির), সেটা কিছুটা হলেও সমঝোতা করতে হয়েছে। এটা নিয়ে হয়তো বা কিছু প্রশ্ন এসেছে। আপনাদের মধ্যেও কিছু জিজ্ঞাসা রয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি চলার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে রক্ষণাবেক্ষণের যেটা লং ডিউ ছিল, ইস্টার্ন রিফাইনারির দুটি ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছি।’ দুবাইয়ের একটি হোটেলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সেখানেও কিন্তু তারা এই সুযোগে রক্ষাবেক্ষণে ১৮ মাসের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে তারা এ রকম একটি সুযোগে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ কাজগুলো করার চেষ্টা করে। আমরাও এই সুযোগে রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করে ফেলছি, যাতে করে এই মাসের শেষে যখন ক্রুড অয়েল আসবে-আমরা যেন ফুল ক্যাপাসিটিতে (ইআরএল) রান করতে পারি।’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবনে দুর্ভোগ হচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কৃষি ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। ‘এটা বোরো মৌসুম। সেচপাম্প চালাতে কৃষকের যেন কোনো অসুবিধা না হয়, পিক আওয়ারে যেন তারা বিদ্যুৎ পায়, ডিজেল পায়, এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেমন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন যেন কোনোভাবে বিঘ্নিত না হয়; সেটাও নিশ্চিত করছি। কারণ এর সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যাপার রয়েছে। এ কারণে বাসাবাড়িতে কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। তিনি বলেন, মে মাসের প্রথম থেকে ফসল ওঠা শুরু করবে। তখন কৃষির (বিদ্যুৎ) চাহিদা কমে যাবে। স্বাভাবিকভাবে এটা (বিদ্যুৎ) তখন আবার আমরা বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক সরবরাহ করতে পারব।’

২০২৯ সাল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান। এ সময় জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক, জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ডিজেলবাহী তিনটি ও অকটেনবাহী একটি জাহাজ বন্দরে : পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে আরও তিনটি এবং অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় রয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার দুপুরে ‘এমটি ওক ট্রি’ নামের একটি জাহাজ বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে এসেছে। এছাড়া রাতে ‘এমটি কেইপ বনি’ এবং ‘এমটি লিয়ান সং হু’ নামে অপর দুটি জাহাজ মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আর ‘এমটি নেইভ সিয়েলো’ নামের অকটেনবাহী একটি জাহাজও পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে রোববার মালয়েশিয়া থেকে ‘এমটি গোল্ডেন হরাইজন’ নামে ডিজেলবাহী আরও একটি জাহাজ আসছে। সব মিলিয়ে ৪টি ট্যাংকারে ১ লাখ ৪১ হাজার টন ডিজেল আসছে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেলবাহী ৪টি ট্যাংকার জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পাঁচটি জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইনস। এর মধ্যে এমটি ওক ট্রি বন্দরের বহির্নোঙরের আলফা অ্যাংকরেজে রয়েছে। বাকি জাহাজগুলো বহির্নোঙরের জলসীমায় রয়েছে।

প্রাইড শিপিং লাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, ডিজেল ও অকটেনবাহী পাঁচটি জাহাজ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যেই বন্দরে পৌঁছবে।