এক সপ্তাহ ধরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভুগছে ৯ মাসের শিশু রুকাইয়া বিনতে হাফিজ। শরীরে র্যাশ, তীব্র জ্বর, চোখ লাল ও নাক দিয়ে পানি পড়াসহ মিজেলস ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত এই শিশু। মৌসুমি জ্বর ভেবে শিশুর মা ঘরোয়াভাবে সেবাশুশ্রূষা করেন। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় বুধবার দুপুরে সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় রুকাইয়াকে। চিকিৎসক সাপোজিটরি, অয়েন্টমেন্ট ও আরও কিছু ওষুধসহ ব্যবস্থাপত্র দিয়ে মায়ের সঙ্গে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বৃহস্পতিবার জ্বর-র্যাশের সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্টে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পাবনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে শয্যা না পেয়ে বারান্দায় ভর্তি করে অক্সিজেন, ইনজেকশন ও ওষুধ দেওয়া হয়।
রুকাইয়ার বাবা হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে শুক্রবার জানান, মেয়ের নিশ্চিত হাম জেনেও উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি। জেলা সদরে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও শয্যা পাইনি। পরে হাসপাতালের এক চিকিৎসকের পরামর্শে তার ব্যক্তিগত চেম্বারে যাই। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। ব্যবস্থাপত্রে নেবুলাইজারের মাধ্যমে দিনে চারবার অক্সিজেন দিতে বলেছেন। একগাদা ওষুধ লিখেছেন। ফার্মেসি থেকে নেবুলাইজার মেশিন ও ওষুধ কিনে বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে এসেছি। রাত নামলেই পরিস্থিতি কী হয় তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় পড়ে যাই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু পাবনা জেনারেল হাসপাতালই নয়, সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে এই রোগীর চাপ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকুলান না হওয়ায় বেশির ভাগ রোগী মেঝে-বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গুরুতর অসুস্থদের অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যা (আইসিইউ) সাপোর্টের দরকার হচ্ছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে দেশের ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। হামের জটিলতার মধ্যে আছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, এনকেফালাইটিস, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা। শুক্রবার বিকালে পাবনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, হাম উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২০ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ৫৮ শিশু ও ৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাম উপসর্গ নিয়ে জানুয়ারি থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৪২৪ জন। শুধু মার্চেই ভর্তি হন ৩২৮ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৩৫৮ জন।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল হাসান বলেন, তাদের হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মোট শয্যা ৩৮টি। হামের আউটব্রেক শুরুর পর ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ (কেএমসি) ইউনিটের চারটি বেডকে রোগীদের জন্য আইসোলেশন করা হয়। মার্চে রোগীর চাপ বাড়ায় জরুরি বিভাগের পাশে ১২ শয্যার আরও একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। তাতেও শয্যার সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের বারান্দা ও মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। রোগটি অত্যন্ত সংক্রমিত হওয়ায় অন্য শিশুরা ট্রান্সমিশনের (হাম সংক্রমণ) ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে তিনগুণ বেশি রোগী থাকছেন। কিন্তু পেডিয়াট্রিক ইউনিটের সিনিয়র কনসালটেন্টসহ ২৪ জন চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। নার্স ও ক্লিনারের বেশকিছু পদে জনবল নেই। এক্স-রে ও প্যাথলোজি বিভাগে রি-এজেন্ট ছাড়াও হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসক-নার্সরা দিনরাত সেবা দিচ্ছেন।
শুক্রবার বিকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, দেশে হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে। ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম শুরু করলে এটা আরও কমে যাবে। আশা করি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
টিকার কোনো ঘাটতি নেই জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো টিকার ঘাটতি নেই। সব ধরনের টিকার পর্যাপ্ত মজুত আছে। যে পরিমাণ মজুত আছে, আগামী জুন মাস পর্যন্ত বিনা বাধায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব। তবে আগামী মাসে দশমিক শূন্য পাঁচ (.০৫) সিরিঞ্জের কিছু ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে এটি পাইপলাইনে আছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে এ ঘাটতিও পূরণ করতে পারব।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেভাবে হামের রোগী ঢাকায় আসে এজন্য ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর কিছুটা চাপ পড়ে। সে সমস্যা সমাধানে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে আরও পাঁচজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে তিনজন হাম আক্রান্ত হয়েই মারা যান বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি দুজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগী শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ১১৫ জন। এ ছাড়া ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ৪৬৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ১২৭ জন ও ১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত তিন হাজার ১৯২ জন শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৮৯৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ছাড় পেয়েছেন ১১ হাজার ২৪৩ জন। চলতি বছর নিশ্চিত হামে ৩৭ ও সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১৭৪ জনের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিশুদের চিকিৎসায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও কুমিল্লায় ৬টি বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হয়। যেখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রসহ (এনআইসিইউ) এক হাজার ৫০টি শয্যা রয়েছে। হাসপাতালগুলোর ভবন নির্মাণে সরকারের ৩২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। কিন্তু বিপুল ব্যয়ে আধুনিক হাসপাতালগুলোর ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কয়েক বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হয়নি। অব্যবহৃত অবকাঠামো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, একাধিক ভবনে চুরির ঘটনাও ঘটছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হামের টিকা নেওয়ার পর সেটি শরীরে হামের বিরুদ্ধে কার্যক্ষমতা তৈরিতে দুই-তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তাছাড়া এক ডোজে শতভাগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। চলমান বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার মাসখানেকের মধ্যে প্রাদুর্ভাব কমে আসবে। এখন যেসব শিশু আক্রান্ত হচ্ছে তাদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকবে।