বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান আজ (শুক্রবার) ভোরে মারা গেছেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি গত মাসে যান আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনে। সচিব সেখানে ছিলেন ৯ দিন।
সচিবের এই মৃত্যুতে হতবাক শীর্ষ প্রশাসন। তারা মনে করতেন, বাংলাদেশ প্রায় ম্যালেরিয়া মুক্ত হওয়ার পথে। শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তার মৃত্যুতে নড়েচড়ে বসার সুযোগ মিলেছে স্বাস্থ্যপ্রশাসনের।
জানা যায়, সচিবের বয়স হয়েছিল ৫৮। রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে। এ সময়ই ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয় তার।
ঢাকায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণের কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। ম্যালেরিয়া নিয়ে রাজধানীতে মারা যাওয়া সবাই ঢাকা বা দেশের বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন
রাজধানীতে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় আসে সচিবের মৃত্যুর খবরে। অবশ্য ঢাকায় ম্যালেরিয়া রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পাওয়ার কথা আগে থেকেই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকায় স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়ায় সংক্রমণের খোঁজ মেলেনি। ঢাকায় সংক্রমণের তথ্য না মিললেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের হার আবার বাড়ছে নতুন করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদ স্পষ্ট করেন, ‘ঢাকায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণের কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। ম্যালেরিয়া নিয়ে রাজধানীতে মারা যাওয়া সবাই ঢাকা বা দেশের বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন।’
ম্যালেরিয়ার বাহক থেকে প্যারাসাইট গ্রহণ করে মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে ম্যালেরিয়ায়; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিচালক বললেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাম্প্রতিক সময়ের সফর ছিল ক্যামেরুনে। ম্যালেরিয়া এখনো প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা ওই দেশে। বাংলাদেশে ফেরার পর ম্যালেরিয়ার একটি মারাত্মক ভেরিয়েন্ট শনাক্ত হয় সচিবের। এছাড়া বেশ দেরি হয়েছিল তার চিকিৎসা শুরু করতে।’
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪ তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নিতে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ ছয়জনের একটি দল ক্যামেরুন সফর করেন গত মাসে। তারা ২৪ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত অবস্থান করেন ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্দুতে। এই দলে ছিলেন সচিব মাহবুবুর রহমানও। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন সেখানেই।’
ঢাকায় ম্যালেরিয়া রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে ২০২৩ সাল থেকেই। এ পর্যন্ত খোঁজ মিলেছে ছয়টি প্রজাতির। গত সপ্তাহে সন্ধান মিলেছে নতুন তিন প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ক্যামেরুন। এই দেশে বছরভেদে ৬০-৭০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয় ম্যালেরিয়ায়। আর মারা যায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন তুলে ধরেন, ‘দেশে ফেরার পর থেকেই মৃদু জ্বরে ভুগছিলেন সচিব মাহবুবুর রহমান। পরে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন গত সোমবার থেকে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের খবর জানা যায় সেখান থেকেই।’
এই কর্মকর্তা জানান, ক্যামেরুন সফরের আগে সবাই নিয়েছিলেন ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ব্যবস্থা। মাহবুবুর রহমান ছাড়া সুস্থ আছেন সফরকারী দলের অন্য সদস্যরা। তিনি সর্বশেষ অফিস করেছেন গত ৯ এপ্রিল।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দাবি করেন, ‘ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ওষুধ খাওয়া ও টিকা নিতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা দেশ সফরের আগে। নিশ্চিত হওয়া দরকার সচিব সেসব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কিনা। তবে অন্যান্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রাখাও প্রয়োজন মশার কামড় এড়াতে।’
এদিকে স্থাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, সরকার চায় ২০৩০ সালের মধ্যে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনতে। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চলছে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলে দাবি করা হয় ৫১ জেলাকে। তবে পার্বত্য অঞ্চলের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলাকে ধরা হয় ম্যালেরিয়ার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে।
স্থাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে ২০১৪ সাল থেকে। ২০২১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল সেই ধারা। তবে আবার বাড়তে শুরু করেছে এর সংক্রমণ। এমনকি ঢাকাতেও ম্যালেরিয়া রোগের জন্য দায়ী অ্যানোফিলিস মশার দেখা মিলছে।
কয়েক বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক কবিরুল বাশার। তিনি জানান, ঢাকা শহরে ম্যালেরিয়া রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশা ও মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে ২০২৩ সাল থেকেই। এ পর্যন্ত খোঁজ মিলেছে ছয়টি প্রজাতির। গত সপ্তাহে সন্ধান মিলেছে নতুন আরও তিন প্রজাতির মশার।
এই কীটতত্ত্ববিদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখনো নজরে আসেনি স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের ঘটনা। তবে ম্যালেরিয়ার বাহক থেকে প্যারাসাইট গ্রহণ করে মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে ম্যালেরিয়ায়; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।’
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়টি আমলে নিয়ে এখনই কাজ করা দরকার বলে জানান তিনি।
