দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ৫০টি শীর্ষ অটো রাইস মিল। মোট চালের ২০ শতাংশ মজুত থাকে এই মিলগুলোর হাতে। চিনির বাজারের ৭০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ শীর্ষ দুই কোম্পানি। ভোজ্য তেল আমদানি ‘দ্য বিগ ফোর’-এর হাতে। দেশে ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। অপরদিকে ডিমের দামের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য তৈরি করা এক প্রতিবেদনে এই সিন্ডিকেটের তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিবেদনটির পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন বিআইডিএস-এর প্রতিনিধি দল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, চাল, ডাল, তেল, চিনি, আলু, পিঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থা ও সুবিধাভোগীদের মতামত গ্রহণ করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এরই অংশ হিসেবে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করেছে বিআইডিএস। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটির পরিবর্তে ‘অলিগোপলি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ‘অলিগোপলি’ বলতে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বা শিল্প গ্রুপগুলোকে বোঝানো হয়েছে, যারা বাজারের বিভিন্ন পণ্য বা সেবা নিয়ন্ত্রণ করে। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। এগুলো হলো অবকাঠামো ও জলবায়ু প্রতিবন্ধকতা, আমদানি নির্ভরতা ও ব্যয় সংকট এবং অপ্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামা। এই তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অলিগোপলি বা সিন্ডিকেটের বিষয়টি তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ‘অলিগোপলি’র কারণে পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছে বিআইডিএস।
প্রতিষ্ঠানটির উপস্থাপনায় চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, আলু, পিঁয়াজ এবং ডিম- এই সাত পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি তুলে ধরে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। চালের বাজারে অটোরাইস মিলগুলোর নিয়ন্ত্রণ কমাতে মিলগেটে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার এবং ওএমএস কর্মসূচিতে ভর্তুকির সুপারিশ করা হয়েছে। ভোজ্যতেল আমদানির ক্ষেত্রে শূন্যশুল্ক এবং ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুরগির খাদ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মসুর, মুগ, ছোলাসহ বিভিন্ন ধরনের ডাল জাতীয় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত ঢাকার মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ডালের দামের বাজার ঠিক করে দেয়। অনুরূপভাবে ডিম ও মুরগির বাচ্চা আমদানি এবং মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশে ডিমের বাজারে কাজী ফার্মস, প্যারাগন, ডায়মন্ড এগ, নাবিল গ্রুপ-এর মতো করপোরেট কোম্পানিগুলো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই কোম্পানিগুলো আধুনিক খামারে উৎপাদিত ডিমের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। ফলে দাম নির্ধারণেও ভূমিকা রাখে এই কোম্পানিগুলো। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে দেশের বড় বড় অটোরাইস মিলগুলো। অনেক ক্ষেত্রে টেলিফোন করে মোকামে চালের দাম ঠিক করে মিল মালিকরা। এমনো দেখা যায়, অন্যান্য দেশে দাম কম থাকলেও বাংলাদেশে এসব পণ্যের দাম বেশি। চিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেঘনা ও সিটি গ্রুপের নাম উল্লেখ করে বিআইডিএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই শীর্ষ কোম্পানি অপরিশোধিত চিনি আমদানির ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এককভাবে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে মেঘনা গ্রুপ। এনবিআরের হিসাবে, দেশে মোট আমদানির ৫০ শতাংশই আসে এ কোম্পানিটির মাধ্যমে।
এ ছাড়া সিটি গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় ২৪ শতাংশ অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়। এ ছাড়া চার বড় কোম্পানি- সিটি, মেঘনা, এস আলম এবং টিকে গ্রুপ এই চারটি কোম্পানিকে ভোজ্যতেলের বাজারের ‘দ্য বিগ ফোর’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিআইডিএস। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভোজ্যতেল আমদানির ৮০ শতাংশ আমদানি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ভোজ্যতেল ও চিনির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বৃদ্ধি এবং আরোপিত বিভিন্ন ধরনের শুল্ক স্থানীয় মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমানো, এলসি মার্জিন হ্রাস করা এবং টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুপারিশ করা হয়েছে। আলুর বাজারে অস্থিরতা নিয়ে বিআইডিএস বলেছে, দেশে আলুর চাহিদা ৯০ লাখ মেট্রিক টন। অথচ হিমাগার সক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। প্রয়োজনীয় কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় উৎপাদন মৌসুমে আলুর দামের পতন ঘটে। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। সবজিটির মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। পিঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ভারত নির্ভরতা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে মসলাজাতীয় পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে। তার আগেই আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে।
সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস সবকিছুর দাম বেশি : রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ পণ্যের দাম এখনো বাড়তি। কাঁচাবাজারের দ্রব্যমূল্যের চাপে জনজীবনে দেখা দিয়েছে অস্বস্তি। সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস সবকিছুর দাম বেশি। বেশির ভাগ সবজি ৮০-১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া খুচরা বাজারে অনেকদিন ধরেই সোনালি মুরগি, সয়াবিন তেলে সংকট চলছে। নতুন করে দাম বেড়েছে ফার্মের মুরগির ডিমের। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে পরিবহন ব্যয় বেশি ও সরবরাহ সংকটের কারণে গত এক-দুই মাস এসব পণ্যের দাম বেড়েছে।
গতকাল মিরপুর-১১ ও মিরপুর-৬ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, পটোল, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৮০ টাকা, শিম ও শজিনা ৮০-১২০ টাকা, আর ঝিঙ্গা, করলা, বরবটি ৮০-১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দাম কাঁকরোলের, বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৬০ টাকায়। আলু ২০-২৫, পিঁয়াজ ৪০-৫০ এবং কাঁচামরিচ ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজের লাউ পিস প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। টম্যাটো ৫০, পেঁপে ৪০-৫০ ও বেগুন ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও সোনালি মুরগি এখনো উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে, প্রতি কেজি ৩৮০-৪২০ টাকা। গরুর মাংস ৮০০-৮৫০ ও খাসির মাংস ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের মধ্যে রুই ও কাতলা মাছ কেজিপ্রতি ৩২০-৩৮০, পাঙাশ ১৮০-২০০ এবং তেলাপিয়া ১৮০-২২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। চিংড়ির দাম কেজিপ্রতি ৬৫০-৭৫০ টাকা। মাঝারি আকারের কই মাছ ২০০-২৫০, দেশি শিং ৬৫০-৭৫০, শোল ৬৫০, সুরমা ৩০০-৩৫০ এবং পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিকন মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৬০-১৭০ এবং মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় মুগ ডাল ১৪০, ছোট মুগ ডাল ১৭০, খেসারি ডাল ১০০, বুটের ডাল ১১৫ এবং মাষকলাই ডাল ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল ৮৫-৮৮ ও রশিদ মিনিকেটের দাম ৭৫-৮০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। নন-ব্র্যান্ডের মিনিকেটের দাম ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দামি মিনিকেট মোজাম্মেল বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। বাজারে খোলা সুগন্ধি চাল কেজি ১২০-১৫০ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৯০-১৩০ টাকা। কালিজিরা ও চিনিগুঁড়া ধরনের সুগন্ধি চালের এক কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে কোম্পানিভেদে ১৭০-১৭৫ টাকায়।